আর্ন্তজাতিক

মিয়ানমারের সামরিক বাহিনীকে বৈধতা দেয়ার অভিযোগ অস্ট্রেলিয়ার বিরুদ্ধে

অস্ট্রেলিয়ার বিরুদ্ধে রোহিঙ্গা গণহত্যার অপরাধে অভিযুক্ত মিয়ানমারের সেনাবাহিনীকে বৈধতা ও গ্রহণযোগ্যতা দেয়ার অভিযোগ ওঠেছে। সম্প্রতি তাতমাদাও নামে পরিচিত এ বাহিনীর সেনাবাহিনীর প্রধান জেনারেল মিন অং হ্লাইয়াং অস্ট্রেলিয়ার রাষ্ট্রদূতের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছে। সাক্ষাতে অস্ট্রেলিয়ায় নিজের সেনাদের প্রশিক্ষণ দেয়ার প্রস্তাব দিয়েছেন তিনি। এ খবর দিয়েছে দ্য গার্ডিয়ান।

খবরে বলা হয়, হ্লাইয়াং মিয়ানমার সেনাবাহিনীর সুপ্রিম কমান্ডার। এই বাহিনীর বিরুদ্ধে মিয়ানমারের সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠী রোহিঙ্গাদের ওপর ২০১৭ সালে নৃশংস ও নিয়মতান্ত্রিকভাবে নিপীড়ন চালানোর অভিযোগ রয়েছে। উঠেছে গণহত্যার অভিযোগও। ওই বছর বাহিনীটির ‘নিধন অভিযান’ এতটাই নৃশং ছিল যে, প্রাণ বাঁচাতে বাংলাদেশে পালিয়ে আসে প্রায় ১০ লাখ রোহিঙ্গা। সামরিক অভিযানের নামে হত্যা করা হয় হাজার হাজার রোহিঙ্গাকে, গণধর্ষণ করা হয় নারী ও অল্পবয়স্কাদের, প্রসূতিদের করা হয় নির্যাতন।

অনেককে নিজের ঘরে জ্যান্ত পুড়িয়ে হত্যা করা হয়। জাতিসংঘ এই অভিযানকে ‘জাতি নিধন’ হিসেবে বর্ণনা করেছে। মিয়ানমার সেনাবাহিনীর প্রধানসহ শীর্ষ জেনারেলদের বিরুদ্ধে গণহত্যার অভিযোগে তদন্ত চালুর আহ্বান জানিয়েছে। আন্তর্জাতিক আদালতে মিয়ানমারের বিরুদ্ধে গণহত্যার মামলা দায়ের হয়েছে।

এদিকে, গত ২৯শে জানুয়ারি মিয়ানমারে নিযুক্ত অস্ট্রেলিয়ার রাষ্ট্রদূট আন্ড্রিয়া ফকনারের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছেন হ্লাইয়াং। রাজধানী নেপিডোস্থ ব্যায়িন্তনাউং ভিলায় এ সাক্ষাৎ হয়। এতে দুজনের মধ্যে উপহার সামগ্রী বিনিময় হয় ও উভয়ে একসঙ্গে ছবি তোলেন। মানবাধিকার সংগঠন হিউম্যান রাইটস ওয়াচ (এইচআরডব্লিউ) জানিয়েছে, অস্ট্রেলিয়া এই সাক্ষাতে রাজি হয়ে গণ নিপীড়নকারী সামরিক বাহিনীকে বৈধতা ও গ্রহণযোগ্যতা এনে দিয়েছে।
হ্লাইয়াং মিয়ানমারের সবচেয়ে প্রভাবশালী ব্যক্তি হিসেবে পরিচিত। তিনি ফকনারের সঙ্গে সাক্ষাৎ নিয়ে বলেন, মিয়ানমার ও অস্ট্রেলিয়ার মধ্যকার দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক উন্নতি করা নিয়ে আলোচনা করেছেন তারা। বলেন, অস্ট্রেলিয়া মিয়ানমারের পুরনো বন্ধু। তারা দুই দেশের সামরিক শক্তির মধ্যে প্রতিরক্ষা সহযোগিতা বৃদ্ধি, অস্ট্রেলিয়ায় প্রশিক্ষণের জন্য আরো সেনা পাঠানো ও ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলের ভুতাত্ত্বিক রাজনীতি নিয়ে আলোচনা করেছেন।

এ ছাড়া, তারা রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে সেনাবাহিনীর ‘নিধন অভিযান’ নিয়ে মিয়ানমার সরকারের তদন্ত, আন্তর্জাতিক বিচার আদালতে গাম্বিয়ার মামলা, মিয়ানমারের ওপর আদালতের অন্তর্বর্তী নির্দেশ ও মাদক-বিরোধী অভিযানে অস্ট্রেলিয়ার সহায়তা নিয়েও আলোচনা করেছেন তারা।

উল্লেখ্য, ২০১৭ সালে রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে সহিংসতার অভিযোগ ওঠার পর মিয়ানমারকে সঙ্গে সকল ধরণের সামরিক সহযোগিতা প্রদান বন্ধ করে দিয়েছে ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন (ইইউ), বৃটেন, যুক্তরাষ্ট্র, ফ্রান্স ও কানাডা। মিয়ানমার সামরিক বাহিনীর সঙ্গে সম্পৃক্ততা রক্ষার নীতি মেনে চলা গুটিকয়েক দেশগুলোর একটি হচ্ছে অস্ট্রেলিয়া। তবে সে সম্পৃক্ততা কেবল নন-কমব্যাট বিষয়গুলোয়। প্রতিবছর মিয়ানমার সেনাবাহিনীকে মানবিক সহায়তা, ইংরেজি ভাষা শেখানো ও শান্তিরক্ষায় ৪ লাখ ডলারের প্রশিক্ষণ, সহায়তা করে থাকে দেশটি।

হ্লাইয়াংয়ের সঙ্গে ফকনারের এটাই প্রথম সাক্ষাৎ ছিল না। অন্যান্য অস্ট্রেলিয়ান রাষ্ট্রদূতরাও মিয়ানমারের সেনাপ্রধানের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছেন। জাতিসংঘ মানবতাবিরোধী অপরাধ, যুদ্ধাপরাধ ও গণহত্যার অভিযোগে তার বিরুদ্ধে তদন্ত ও বিচারের আহ্বান জানিয়েছে। ব্যক্তিগত পর্যায়ে তার ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে যুক্তরাষ্ট্র। এদিকে, অস্ট্রেলিয়া রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে সহিংসতায় মিয়ানমারের পাঁচ শীর্ষ জেনারেলের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করলেও সরাসরি হ্লাইয়াংয়ের ওপর কোনো নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেনি।
এইচআরডব্লিউ’র অস্ট্রেলিয়া শাখার পরিচালক এলেইন পিয়ারসন বলেন, অস্ট্রেলিয়ার উচিৎ মিয়ানমারের সঙ্গে এসব সাক্ষাৎ এড়িয়ে চলা। এগুলো তাদের সামরিক বাহিনীকে অধিকার লঙ্ঘনের দায়কে হালকা করে দিচ্ছে। তিনি বলেন, অস্ট্রেলিয়ার উচিৎ মিন অং হ্লাইয়াংয়ের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা, ছবি তোলা নয়। গণনিপীড়নের অপরাধে তদন্তের সম্মুখীন কারো সঙ্গে উপহার বিনিময় করা উচিৎ নয়। তিনি আরো বলেন, মিয়ানমারের কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠকে অস্ট্রেলিয়ার কখনোই রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে জাতি নিধনের কোনো পরিণাম নেই, পরিস্থিতি স্বাভাবিক রয়েছে, এমন মনোভাব প্রকাশ করা উচিৎ নয়।

হ্লাইয়াংয়ের সঙ্গে রাষ্ট্রদূতের সাক্ষাৎ নিয়ে দেশ অস্ট্রেলিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী ম্যারিজ পেনিকে চিঠি লিখেছেন পিয়ারসন। তাতে লিখেছেন, হ্লাইয়াং এই সাক্ষাৎ আন্তর্জাতিক পর্যায়ে তার ভাবমূর্তি বাড়ানো ও তার নেতৃত্বাধীন সামরিক বাহিনীর বৈধতা ফিরিয়ে আনতে করেছেন। পিয়ারসন লিখেন, মিন অং হ্লাইয়াং অত্যন্ত দ্রুততার সঙ্গে এই সাক্ষাতটিকে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে জনগণের কাছে নিজের ভাবমূর্তি বাড়িয়েছেন। নিজের ওয়েবসাইটে রাষ্ট্রদূত ফকনারের সঙ্গে নিজের ছবি পোস্ট করেছেন।
হ্লাইয়াংয়ের সঙ্গে সাক্ষাতের ব্যাপারে জানতে চেয়ে অস্ট্রেলিয়ার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে যোগাযোগ করলে কোনো সাড়া পায়নি গার্ডিয়ান।