জাতীয়

মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার খোলার সম্ভাবনা চলতি মাসে

চলতি মাসের শেষ সপ্তাহে ঢাকায় হতে যাচ্ছে বাংলাদেশ-মালয়েশিয়া জয়েন্ট ওয়ার্কিং গ্রুপের গুরুত্বপূর্ণ সভা। এই বৈঠকে হিসাব-নিকাশ মিলে গেলে দীর্ঘদিন বন্ধ থাকা শ্রমবাজার খোলার আনুষ্ঠানিক ঘোষণা চলেও আসতে পারে।

তবে আগের মতো ১০ রিক্রুটিং এজেন্সির মাধ্যমে সিন্ডিকেট করে কর্মী যাবে নাকি বায়রার দেড় সহস্রাধিক সাধারণ সদস্যের সবাই ব্যবসা করতে পারবে, সেটি এখন বেশি আলোচিত হচ্ছে। তার চেয়ে বড় গুঞ্জন, আসলেই মালয়েশিয়া সরকার বাংলাদেশী কর্মীদের জন্য জন্য শ্রমবাজার খুলতে যাচ্ছে কি না?

আর যদি খোলার ঘোষণা দেয়ার চিন্তাভাবনা মাহাথির মোহাম্মদ সরকারের থেকে থাকে, তাহলে কবে কখন সেই আনুষ্ঠানিক ঘোষণা হবে সেদিকেই এখন সবার নজর।

গতকাল জনশক্তি রফতানিকারকদের সংগঠন বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব ইন্টারন্যাশনাল রিক্রুটিং এজেন্সির (বায়রা) কার্যনির্বাহী কমিটির একাধিক সদস্য নাম না প্রকাশের শর্তে বলেন, আগামী ২৩ ফেব্রুয়ারি মালয়েশিয়া থেকে উচ্চ পর্যায়ের প্রতিনিধিদল ঢাকায় আসছেন। তবে প্রতিনিধিদলে হিউম্যান রিসোর্স মিনিস্টার থাকছেন কি না সেটি জানা যায়নি।

সম্প্রতি প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় থেকে ঢাকায় জয়েন্ট ওয়ার্কিং গ্রুপের বৈঠকে অংশ নেয়ার জন্য মালয়েশিয়ায় চিঠি দেয়া হয়। ওই চিঠির পরিপ্রেক্ষিতে মালয়েশিয়া সরকার ঢাকায় আসার আগ্রহের কথা জানিয়েছে। ২৪ ফেব্রুয়ারি জয়েন্ট ওয়ার্কিং গ্রুপের বৈঠক হবে।

তারা জানান, এবার আমরা আর মার্কেট নিয়ে আগাম কোনো মন্তব্য করব না। তবে আমরা আশাবাদী গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকের পরই হয়তোবা ব্যাটে বলে মিলে গেলে স্থগিত শ্রমবাজারটি খুলে দেয়ার ঘোষণা চলে আসতে পারে। আবার এই মিটিংয়ে না হলেও পরে হয়ে যাবে।

বায়রার দায়িত্বশীল নেতারা বলেন, আমরা যতটুকু জেনেছি তাতে মালয়েশিয়ায় এই মুহূর্তে অনেক শ্রমিকের দরকার। কর্মীর অভাবে অনেক কোম্পানি বন্ধ হওয়ার উপক্রম হয়েছে। সেই সব বিবেচনা করলে ধরে নেয়া যেতে পারে, আগামী মাসের মধ্যে মালয়েশিয়ার মার্কেটটি খুলে যাচ্ছে।
এক প্রশ্নের উত্তরে তারা বলেন, মার্কেট খুলে গেলে আমরা মন্ত্রী মহোদয়ের নির্দেশনা মোতাবেক এবার শ্রমবাজারের সবদিকে কঠোর মনিটরিং রাখব। যাতে কোনোভাবেই অভিবাসন ব্যয় বেশি নিতে না পারে। যাতে মার্কেট ক্ষতিগ্রস্ত না হয়। তা ছাড়া এবার যে ফর্মুলায় শ্রমবাজার খুলতে যাচ্ছে, তাতে অভিবাসন ব্যয় কোনোভাবেই কোনো মালিক বেশি নিতে পারবে না। এবার টাকা জমা হবে ব্যাংকের মাধ্যমে। এরপরও কোনো এজেন্সির বিরুদ্ধে যদি অতিরিক্ত টাকা নেয়ার অভিযোগ উঠে তাহলে আমরা কঠোর ব্যবস্থা নিতে পিছপা হবো না। যে যত বড় এজেন্সির মালিক হোক না কেন?

গতকাল বায়রার একাধিক সদস্য টেলিফোনে জানতে চান, মালয়েশিয়ার শ্রমবাজারে এবারো সিন্ডিকেট হচ্ছে কি না? তারা এমন আশঙ্কা করে বলছেন, সিন্ডিকেট হলে সাধারণ ব্যবসায়ীরা এবার তাদের প্রতিরোধে যেকোনো ধরনের পদক্ষেপ নিতে পিছপা হবে না। ব্যবসা করলে সবাই যাতে করতে পারে সেভাবেই যেন মন্ত্রণালয় ও বায়রা পদক্ষেপ নেয়।

প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের পলিসি লেভেলের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেন, এই মুহূর্তে মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার খোলাটা জরুরি হয়ে পড়েছে। কারণ শুধু সৌদি আরব, ওমানসহ হাতেগোনা চার-পাঁচটি দেশে শ্রমিক যাচ্ছে বেশি। এখনো গুরুত্বপূর্ণ শ্রমবাজার ইউএই বন্ধ হয়ে আছে। কাতারে বাংলাদেশীরা অপরাধে জড়িয়ে পড়ার কারণে দেশটির সরকার শ্রমিক নেয়াই বন্ধ করে দিয়েছিল। তাই যে করেই হোক এখন মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার খুলতে না পারলে পরিস্থিতি আরো খারাপের দিকে যেতে থাকবে বলে তিনি জানান।

তবে তিনি আশঙ্কা করে বলেন, সিন্ডিকেটের দোহাই দিয়ে যাতে শ্রমবাজারটি দীর্ঘদিন আর বন্ধ না থাকে সেদিকেও তাদের নজর রয়েছে। এর আগে ঢাকার দোহারে এক অনুষ্ঠানে বায়রার সাবেক সভাপতি বিশিষ্ট ব্যবসায়ী নূর আলী স্পষ্ট করে বলেছেন, এবার নো সিন্ডিকেট। মার্কেট খুললে সবাই ব্যবসা করবে। একই অনুষ্ঠানে বায়রার সাবেক সভাপতি আবুল বাশারও উপস্থিত ছিলেন। তাদের এমন বক্তব্য শুনে কয়েক শ’ রিক্রুটিং এজেন্সির মালিক হাততালি দিয়ে তাদের স্বাগত জানান।

তবে বৃহস্পতিবার রাতে জনশক্তি ব্যবসার সাথে সম্পৃত্ত ‘ক্লিন ইমেজের’ একজন ব্যবসায়ী সিন্ডিকেটের মাধ্যমে মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার আবার খুলতে যাচ্ছে এমন ইঙ্গিত দিয়ে বলেন, সিন্ডিকেট হলেও গতবারের চেয়ে এবার অভিবাসন ব্যয় অনেক কম হবে। এক লাখ ৬০ হাজার টাকার মধ্যে কর্মী যাবে। তিনি বলেন, কম টাকায় কর্মী পাঠানোর যে শর্ত মালয়েশিয়া সরকার দিয়েছে সেভাবেই এবার কর্মী পাঠানো হবে।

এক প্রশ্নের উত্তরে ওই ব্যবসায়ী নাম না প্রকাশের শর্তে দাবি করে বলেন, এবারো গতবারের মতো ১০টি রিক্রুটিং এজেন্সির সাথে আরো ২০০ এজেন্সি কর্মী পাঠানোর সুযোগ পাবে বলে তিনি জানতে পেরেছেন। তবে এবার ‘ওপেন ফর অল নয়’, ‘ওপেন ফর লিমিট’ হতে পারে। সবকিছু মিলিয়ে মালয়েশিয়া সরকার যেভাবে চাইবে সেভাবেই এবার শ্রমবাজার নিয়ন্ত্রিত হবে বলেও তিনি পরিষ্কার করে জানান।

এখন চূড়ান্ত ঘোষণা কখন আসে সেই পর্যন্ত আমাদের সবাইকে ধৈর্য্য ধরে অপেক্ষা করা ছাড়া আর করার কিছু নাই। এর আগে এ প্রতিবেদক মালয়েশিয়ায় গেলে তখন বিভিন্ন পেশার মানুষ শ্রমবাজার সম্পর্কে বলেন, আমাদের লোকজনের কারণে শ্রমবাজার খুলছে না। নতুবা এত দিনে লক্ষাধিক শ্রমিক মালয়েশিয়াতে চলে যেতেন।