আর্ন্তজাতিক

চীনে শোক প্রকাশেরও সুযোগ নেই মৃত মানুষের স্বজনদের

শেয়ার করুন

দুই প্রজন্ম ধরে বসন্ত বিষুবের ১৫ তম দিনে পূর্বপুরুষের সমাধিলয়ে হাজির হয় চীনারা। এই দিন সমাধিলয়ের আগাছা ও আবর্জনা পরিষ্কার করা হয়। রেখে আসা হয় খাবার, ওয়াইন আর নগদ অর্থ যেন দাদা-দাদীরা পরকালে ভালো থাকেন। শনিবার হলো সমাধি পরিষ্কার করার দিবস। যদিও করোনাভাইরাসের কারণে সাম্প্রতিক সময়ে বহু মানুষ মারা গেছেন, তারপরও এ বছর সমাধিলয়ে হাজির হবেন খুব অল্প সংখ্যক মানুষ। চীনের বেশ কিছু অঞ্চলে, বিশেষ করে সংক্রমণের মূলকেন্দ্র উহানে হাজার হাজার পরিবার তাদের মৃত সদস্যদের সৎকারই করতে পারেনি।
উহানে আইটি কর্মী হিসেবে কাজ করেন গাও ইংওয়েই। ফেব্রুয়ারির শুরুর দিকেই তার দাদা গাও শিক্সু করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে মারা যান।

ইংওয়েইর ভাষ্য, “পরিবারের কেউই দাদাকে চিরবিদায় দিতে পারিনি। শেষবারের মতো তার চেহারাও দেখতে পারিনি।” ৭৬ বছর বয়সী গাও শিক্সু নিজ বাড়িতেই মারা গিয়েছিলেন। লাশ উদ্ধারে এসেছিলেন সরকারি কর্মীরা। পরিবারকে শুধু জানালেন, এখনই লাশ পুড়িয়ে ফেলা হবে।
গাও বলেন, “আজ পর্যন্ত আমাদের কোনো ধারণাই নেই কীভাবে দাদার লাশ তারা সৎকার করেছে, দেহাবশেষের ছাই কোথায় বা আমরাই বা কখন সেগুলো নিতে পারবো। আমি জানিও না কোন প্রতিষ্ঠান থেকে ওই লোকগুলো এসেছিল।”

মানুষের মধ্যে ক্ষোভ আরও বেড়েছে কারণ সমাধিলয় পরিচ্ছন্ন করার আচার দেশজুড়েই হয় নিষিদ্ধ করা হয়েছে, কিংবা খুবই কঠোরভাবে সীমিত করেছে কর্তৃপক্ষ। অথচ, স্বাভাবিক সময়ে এসব অনুষ্ঠানে যোগ দিতে মানুষের ঢল নামে। বেইজিং ও শাংহাইয়ের বিভিন্ন সমাধিস্থলে সীমিত সংখ্যক মানুষকে ঢুকতে দেওয়া হবে, যারা আগে থেকেই অনুমতি নিয়ে রেখেছিলেন। উহানে এমন কোনো অনুষ্ঠানই হবে না। মে পর্যন্ত শেষকৃত্য অনুষ্ঠান ও কবর পরিচ্ছন্ন করার অনুষ্ঠান নিষিদ্ধ রেখেছে পৌর সরকার।

দৃশ্যত, স্বাস্থ্য সংক্রান্ত কারণেই এই কড়াকড়ি। কিন্তু বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই সিদ্ধান্তের মাধ্যমে বেইজিং-এর রাজনৈতিক ইচ্ছারও প্রতিফলন ঘটছে। সমাধিস্থলে প্রবেশ নিষিদ্ধ ও সীমিত হওয়ার ফলে আবেগে ভারাক্রান্ত পরিবারগুলো সমবেত হয়ে একযোগে এই রোগ মোকাবিলায় সরকারের অব্যবস্থাপনার সমালোচনা করতে পারবে না। ইতিমধ্যেই সরকারী ব্যর্থতা দেশজুড়ে তীব্র ক্ষোভ সৃষ্টি করেছে। আর শাসক দল কম্যুনিস্ট পার্টির জন্যও বিষয়টি অত্যন্ত সংবেদনশীল।

সরকারি হিসাব অনুযায়ী, উহানে এই রোগে আক্রান্ত হয়ে ২৫৬৩ জন মারা গেছেন। এই শহরেরই এক বাজার থেকে এই রোগ ছড়িয়েছে। কিন্তু টানা দুই মাস নিষ্ক্রিয় থাকার পর শহর যখন সামান্য খুলতে শুরু করেছে, তখন ক্রমেই বিভিন্ন প্রমাণ উঠে আসছে যে, মৃতের প্রকৃত সংখ্যা সরকারী হিসাবের কয়েকগুণ বেশি।
গত দুই সপ্তাহ ধরেই উহানে বিভিন্ন সৎকার কেন্দ্রে মানুষের দীর্ঘ সারি দেখা গেছে। সমাধি পরিষ্কার দিবসকে সামনে রেখে পরিবারের সদস্যদের জানানো হয়েছে যে তারা মৃতদের ভষ্ম সংগ্রহ করতে পারবেন। কেউ কেউ ছয় ঘণ্টা অপেক্ষা করে প্রথমে শবাধার পেয়েছেন। এরপর ভষ্ম পেয়েছেন। এমনই একটি সৎকার কেন্দ্র হানকু ফিউনেরাল হোমের নিজস্ব শ্মশান দিনে ১৯ ঘণ্টা খোলা রাখা হয়। মাত্র দুই দিনেই সেখানে ৫ হাজার শবাধার এসেছে! বেইজিং-ভিত্তিক মোটামুটি স্বতন্ত্র সংবাদ ম্যাগাজিন কাইক্সিন এই খবর দিয়েছে।

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে পোস্ট করা ছবি বিশ্লেষণ করে বিশেষজ্ঞরা অনুমান করছেন যে, ২৩শে মার্চের পর থেকে প্রতিদিন ৩৫০০ শবাধার ফেরত দিয়েছে উহানের বিভিন্ন ফিউনেরাল হোম। সেই হিসাবে উহানে প্রায় ৪২ হাজার মানুষের মৃত্যু হয়েছে। অর্থাৎ সরকারি হিসাবের প্রায় ১৬ গুণ বেশি। রেডিও ফ্রি এশিয়ার পৃথক এক হিসাবও জনপ্রিয় হয়েছে। তাদের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, উহানের ৮৪টি শবদাহকেন্দ্র কোনো বিরতি ছাড়ায় চলছে। প্রত্যেক লাশ পোড়াতে এক ঘণ্টা লাগে। সেই হিসাবে প্রায় ৪৬ হাজার ৮০০ মানুষ মারা গেছে। অর্থাৎ আগের হিসাবের কাছাকাছিই রয়েছে এই সংখ্যা।

উহানের বাসিন্দারাও বলছেন, বিভিন্ন কর্মকান্ড থেকে সরকারি পরিসংখ্যানের কোনো সত্যতা পাওয়া যায় না। ঝাং নামে এক বাসিন্দা বলেন, “এই পরিসংখ্যান সত্য হতেই পারে না। শবদাহচুল্লী দিনরাত চব্বিশ ঘণ্টা চালু আছে। তাহলে এত অল্প মানুষ কী করে মারা যায়?”

মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থাসমূহ সম্প্রতি এই অনুসিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছে যে, চীনের সরকারি মৃত্যুর সংখ্যা বাস্তব পরিস্থিতির চেয়ে অনেক কম। তবে চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র হুয়া চুনিং বৃহস্পতিবার বলেন, করোনাভাইরাস সংক্রমণ নিয়ে চীন স্বচ্ছ ও উন্মুক্ত ছিল। তিনি মার্কিন কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে “নির্লজ্জ্ব” মন্তব্য করার অভিযোগ আনেন।

গাও শিক্সুর প্রায় দুই সপ্তাহ ধরে জ্বর ও নিঃশ্বাসের জটিলতা ছিল। কিন্তু তার পরিবার তার জন্য চিকিৎসার ব্যবস্থা করতে পারেনি। তার নাতি বলেন, “ওই সময় ছিল উহানের সবচেয়ে অন্ধকারময় ও বিশৃঙ্খল সময়। প্রত্যেক মানুষ যেন নিজের প্রাণ রক্ষাতেই তটস্থ ছিল।”

গাওর করোনাভাইরাস পরীক্ষাই করা হয়নি। কিন্তু তার পরিবারের কোনো সন্দেহই নেই যে, এ কারণেই তার মৃত্যু হয়েছে। তার স্ত্রীও পরে অসুস্থ হয়ে যান। পরীক্ষা যখন বাড়ানো হলো, তখন তার পরীক্ষা করা হয়। দেখা গেল যে তার করোনাভাইরাস আছে। তিনি এখনও হাসপাতালে। উহানে এমন বহু পরিবারেরই একই অভিজ্ঞতা হয়েছে।
১২ই ফেব্রুয়ারি ৪৯ বছর বয়সী লিউ চেং মারা যান। তার উভয় শ্বাসযন্ত্রে মারাত্মক সংক্রমণের কারণে মৃত্যু হয় বলে সরকারিভাবে জানানো হয়নি। তার ভাই লিউ জিয়াওবোকে তখন আধা ঘণ্টার মধ্যেই সেখানে আসতে বলা হয়। কিন্তু তিনি আধাঘণ্টার মধ্যে সেখানে পৌঁছাতে পারেননি। গিয়ে দেখেন যে তার ভাইয়ের লাশ পুড়িয়ে ফেলা হয়েছে। লিউ বলেন, “আমাদের জন্য ওই অভিজ্ঞতা অত্যন্ত নির্মম ছিল। তারা সেদিন যা করেছে, তাতে মৃত লাশের প্রতি ন্যুনতম শ্রদ্ধার অভাব ছিল।”

সরকারীভাবে করোনাভাইরাসের যেই পরিসংখ্যান প্রকাশ করা হয়েছে, সেখানে লিউ চেং-এর নাম নেই। ঠিক তেমনি নাম নেই গাও শিক্সুরও। জিয়াওবো বলেন, “হাজার হাজার অজ্ঞাত মৃতদের তালিকায় থাকবে আমার ভাইয়ের নাম।”
উহান ও হুবেই প্রদেশের আশেপাশে যত সমাধিস্থল আছে, তারা বলেছে যে, তাদের কর্মীরাই এ বছর সকল সমাধি পরিচ্ছন্ন করবে। কিছু বেসরকারী কোম্পানিও এগিয়ে এসেছে। তারা বলছে, ফি পরিশোধ করা হলে, প্রিয়জনের সমাধি পরিষ্কার করার সময় সরাসরি স্ট্রিমিং করে দেখতে পারবেন স্বজনেরা।

বেসামরিক মন্ত্রণালয় স্থানীয় কর্তৃপক্ষকে বলেছে, অনলাইনে শেষকৃত অনুষ্ঠান ও কবর পরিষ্কারের অনুষ্ঠান করতে। অনলাইনেই মানুষ শ্রদ্ধা জানাবেন মৃতদের প্রতি। অনলাইনে তারা মৃতদের প্রতি বিভিন্ন জিনিস উৎসর্গ করবেন। হেভেনলি সিমেন্ট্রির ওয়েবসাইটে গ্রাহকরা মৃত স্বজনদের জন্য শ্রদ্ধা ও ভক্তি জানানোর ছবি আপলোড করতে পারবেন। অল্প কিছু টাকা দিলে মৃতদের জন্য ওয়াইনও রেখে আসবে সিমেট্রি কর্তৃপক্ষ।

চীনের সবচেয়ে বড় শেষকৃত অনুষ্ঠান আয়োজনকারী প্রতিষ্ঠান ফু শো ইউহানও কয়েক বছর আগেই অনলাইনে সমাধি পরিষ্কারের সুবিধা দিয়ে আসছে। কিন্তু এতদিন ধরে তা একেবারেই জনপ্রিয় ছিল না। প্রতিষ্ঠানটির সহকারি মহাব্যবস্থাপক ঝোউ চেন বলেন, এই মহামারীর কারণে মানুষ এখন এই অনলাইন সেবা গ্রহণে উতসাহি হচ্ছে।
কিন্তু সমস্যা হলো অনলাইনে শ্রদ্ধা নিবেদন করতে এসেও মানুষ সরকারের কড়া সমালোচনা করেছে। তবে কর্তৃপক্ষের জন্য খুব অসুবিধাও হয়নি। সামাজিক স্থিতিশীলতার জন্য হুমকি হিসেবে যেসব মন্তব্যকে চিহ্নিত করা হচ্ছে, তা মুছে ফেলা হচ্ছে অনলাইন থেকে।

হংকং-এর চাইনিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের নৃবিজ্ঞানের অধ্যাপক অ্যান্ড্রু কিপনিস বলেন, “শেষকৃত্যানুষ্ঠান সবসময়ই বেদনার। পরিবার থেকে হয়তো স্থানীয় কর্তৃপক্ষকে দায়ী করা হয়ে থাকে। এবার হোক সেটা মহামারী বা কোনো গাড়ি দুর্ঘটনা।” তিনি বলেন, “অনেক রাজনৈতিক আন্দোলনই শুরু হয় লাশ বা শহীদদের কেন্দ্র করে। শোক ও ক্ষোভের মধ্যে একটা দৃঢ় সম্পর্ক রয়েছে।” তিনি উল্লেখ করেন, উদারপন্থী দৃষ্টিভঙ্গির কারণে যখন এক নেতা নিহত হলেন, তখনই কিন্তু ১৯৮৯ সালের তিয়ানানমেন স্কোয়ারের আন্দোলন হয়েছিল।

এ নিয়ে শাসক দলও উদ্বিগ্ন। এবার করোনাভাইরাস ঠেকাতে ব্যার্থতার কারণে নজিরবিহীন সমালোচনা শুনতে হয়েছে তাদের। বিশেষ করে ডাক্তারদের সতর্কতা ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা মানুষকে ক্ষুদ্ধ করেছে। চীনের সরকারি হিসাব ও প্রকৃত মৃতের সংখ্যার মধ্যে অসামঞ্জস্যতা নিয়ে আলোচনা শুরু হয়ে গেছে। ফলে রাজনৈতিকভাবে আরও চাপে পড়বে চীনা নেতারা। ইতিমধ্যেই উহানের বিভিন্ন পরিবার শোক প্রকাশের পর্যাপ্ত স্থান নেই বলে অভিযোগ করেছেন। শহরটির এক নারী বাসিন্দা উ আকু কয়েক ঘণ্টা অপেক্ষা করে এক স্বজনের ভষ্ম সংগ্রহ করেছিলেন। অনলাইনে তিনি লিখেছেন, চীনা পরিবারগুলোর এখন শোক ও ঘৃণাকে হজম করা ছাড়া আর কিছুই করার নেই। তার ওই মন্তব্য অনলাইন থেকে পরে মুছে ফেলা হয়েছে।
(ওয়াশিংটন পোস্ট থেকে অনূদিত।)