প্রচ্ছদ সারাদেশ চার বছরের ঈশা জানেনা তার বাবা আর কোনদিন ফিরবে না

চার বছরের ঈশা জানেনা তার বাবা আর কোনদিন ফিরবে না

শেয়ার করুন


জ. ই. আকাশ : ইসরাত জাহান ঈশা। সবেমাত্র ৪ বছরে পা রেখেছে। ফুটফুটে চঞ্চলা এই মেয়েটি সারাবাড়ি হৈচৈ করে মাতিয়ে রাখে। পরিবারের একমাত্র সন্তান হওয়ায় সবার কাছেই বেশ আদরের। আপনাদের মনে হয়তো এতোক্ষনে প্রশ্ন জাগছে কে এই ঈশা? হ্যা ঈশা হলো কিছু দিন আগে ঝিটকা-মানিকগঞ্জ সড়কে ট্রাক-সিএনজি মুখোমুখি সংঘর্ষে নিহত লিটন প্রামানিকের একমাত্র মেয়ে। লিটনের বাড়ি হরিরামপুর উপজেলার গোপীনাথপুর ইউনিয়নের গোপীনাথপুর ভাটিকান্দি গ্রামে। ঝিটকা বাজার থেকে প্রায় ৩ কিলোমিটার দক্ষিণে। দুর্ঘটনার এক সপ্তাহ পর আমি আর আমার একছোট ভাই সাকিব (সাংবাদিক) খুঁজতে খুঁজতে লিটন প্রামানিকের বাড়ি হাজির হই। বাড়িতে পা রাখতেই অনুভব করি এখনো বাড়ি থেকে শোকের ছায়া মিলিয়ে যায়নি। আমরা বাড়িতে উপস্থিত হতেই চোখে পড়ে বাড়ির উঠানে বেশ কয়েকজন প্রতিবেশী। কেউ দাড়িয়ে আছে কেউ বা বসে। আমাদের দেখতেই সবাই অবাক দৃ্ষ্টিতে থাকে আমাদের দিকে। কাছে পরিচয় দিতেই তাড়াহুড়ো করে আমাদের বসতে দেয়। বসার পরে আমি খেয়াল করি আমার ডানপাশে নিথর নিস্তব্ধ নির্বাক বসে আছে লিটনের বাবা আফসার প্রামানিক। উঠানের এককোনে আপন মনে খেলা করছে ৪ বছরের ফুটফুটে লিটনের মেয়ে। তখনও জানিনা এই সেই হতভাগী লিটনের একমাত্র মেয়ে। দুর্ঘনার সাতদিন অতিবাহিত হওয়ার পরেও ঢাকার পুঙ্গ হাসপাতালে ভর্তি লিটনের ছোট চাচা বাচ্চু প্রামানিক জানেনা তার আদরের ভাতিজা আর পৃথিবীতে নেই। লিটনের কথা জানতে চাইতেই হাউমাউ করে কেঁদে ওঠে বাবা আফসার প্রামানিক। কাদতে কাদতে জানায়, মানুষের বাড়ি বাড়ি কামলা দিয়া চার সন্তানকে মানুষ করেছি। এই ভিটেবাড়ি ছাড়া আর কিছুই নেই। বড় ছেলে লিটন আর মেঝ ছেলে রিপনের রোজগারেই আমার সংসার চলে। এখন আমার সুখের সময়ে আল্লাহ আমার বড় মানিককে নিয়ে গেল। তিনি আরও জানায়, লিটন প্রায় সাত বছর যাবৎ গাজীপুর টেক্সটাইল মিলে ষ্টোর অফিসার এবং মেঝ ছেলে রিপন ছাপাখানায় কাজ করে। বাকি দুই ছেলে মানিকগঞ্জ দেবেন্দ্র কলেজে অর্নাস পড়ছে। ঘটনার দিন লিটন ও তার ছোট চাচা বাচ্চু প্রামানিক কর্মস্হলে যাওয়ার উদ্দেশ্যে ভোরে বাড়ি থেকে বের হয়ে ঝিটকা থেকে সিএনজিতে মানিকগঞ্জ রওয়ানা দেয়। সিএনজিটি গালা ইউনিয়নের আলমদী গ্রামের কালভার্ট ব্রীজের ওপর আসতেই ওপরপ্রান্ত থেকে আসা ট্রাকের সাথে মুখোমুখি সংঘর্ষ হলে ঘটনাস্থলেই নিহত হয় লিটন প্রামানিক। আহতদের মধ্যে সিএনজি ড্রাইভার মতিয়ার ও নিহত লিটনের চাচা বাচ্চু প্রামানিককে আশংকাজনক অবস্থায় ঢাকার পঙ্গু হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। রিপন প্রামানিক কান্নাজড়িত কন্ঠে জানায়, আমার ভাই মারা গেছে এখন পর্যন্ত আমার চাচাকে জানাতে পারিনি। কারন আমার চাচা আমাদের এতো ভালবাসে যে লিটনের মৃত্যু খবরটা এইমুহূর্তে দিলে তাকেও আমরা বাঁচাতে পারব না। ভাইকে তো আর ফেরত পাব না। কিন্তু নতুন করে আর চাচাকে হারাতে চাই না।ঘরের বারান্দার এককোনে নিথর হয়ে অপলক তাকিয়ে বসে আছে লিটনের স্ত্রী লিপি আক্তার। স্বামীর অকাল মৃত্যুতে সেও যেন বাকরুদ্ধ। বিয়ের আগে তিনবছরের প্রেম ছিল তাদের মধ্যে। তার সেই ভালোবাসার মানুষটিকে হারিয়ে ৪ বছরের একমাত্র ঈশাকে নিয়ে লিপি যেন আজ অকুল সাগরে নিমজ্জিত দিশেহারা ক্লান্ত পথিক।