হেড লাইন

করোনায় স্থগিত হতে পারে চলতি বছরের হজ

শেয়ার করুন

করোনাভাইরাসের কারণে চলতি বছরের হজ স্থগিত রাখা হতে পারে। এ ব্যাপারে ইতোমধ্যেই সৌদি সরকার তাদের গ্র্যান্ড ফতোয়াবোর্ডসহ বিশ্বের বিভিন্ন ফতোয়াবোর্ড ও ইসলামী বিশেষজ্ঞদের মতামত নিয়েছে বলে জানা গেছে। মহামারী, সঙ্ঘাত ও যুদ্ধ বিগ্রহের কারণে হজ স্থগিত রাখা কিংবা সীমিত আকারে পালনের নজির রয়েছে। ইসলামী বিশেষজ্ঞরাও বলছেন, এই ধরনের পরিস্থিতিতে হজ স্থগিত রাখা যেতে পারে। প্রতি বছর বিশ্বের প্রায় ২০ লাখ মুসলমান হজ পালন করার জন্য সৌদি আরবের মক্কা নগরীতে যান।

সূত্র জানায়, হজের আগে সৌদি আরবের পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়ে এলেও বিশ্ব পরিস্থিতির উল্লেখযোগ্য উন্নতি না হলে সীমিত আকারে অভ্যন্তরীণভাবে হজ কার্যক্রম চালু রাখা হতে পারে। তবে নিজ দেশে করোনা পরিস্থিতির উল্লেখযোগ্য উন্নতি না হলে ওমরাহর পাশাপাশি এ বছরের হজকার্যক্রম সম্পূর্ণ বন্ধ রাখার ঘোষণা দেয়া হতে পারে। এপ্রিল মাসেই এই ঘোষণা আসতে পারে।
হজ স্থগিত রাখা হতে পারেÑ এমন প্রবল আশঙ্কা বাংলাদেশসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশের হজ ব্যবস্থাপনার সাথে যুক্তদের মধ্যে বিরাজ করছে। এর প্রভাব পড়ছে চলতি বছরের হজ গমনেচ্ছুদের ওপর। বাংলাদেশে হজের জন্য নিবন্ধনের সময় এক দফা বৃদ্ধি করার পরও গতকাল মঙ্গলবার পর্যন্ত মাত্র ১২ শতাংশ যাত্রী নিবন্ধন করেছেন। বিশ্বের বিভিন্ন দেশের হজ ব্যবস্থাপনা সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান এবং হজযাত্রীদের মধ্যেও এ বছরের হজ বন্ধ হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা বিরাজ করছে।
সৌদি কর্মকর্তাদের সাথে ঘনিষ্ঠ বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে, সৌদি সরকার নিজ দেশে করোনাভাইরাস ছড়িয়ে পড়া রোধে সবধরনের পদক্ষেপ নিচ্ছে। ওমরাহ, ভিজিট ভিসা, অন্যান্য দেশের সাথে আকাশ, স্থল ও নৌপথে যোগাযোগ প্রায় বন্ধ করে দেয়া, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, শপিংমল, বিনোদন কেন্দ্র বন্ধ রাখা এবং অত্যাবশ্যকীয় তিনটি বিভাগ ছাড়া সব সরকারি কর্মকর্তার অফিসে যাওয়ার ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপের মতো কঠোর সতর্কতামূলক পদক্ষেপ নিয়েছে। ব্যক্তি মালিকানাধীন বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানও বন্ধ করে দেয়া হতে পারে। সৌদি সরকার গতকাল মঙ্গলবার পর্যন্ত দেশটিতে ১৩৩ জন করোনায় আক্রান্ত হওয়ার কথা জানিয়েছে।

সৌদি ধর্ম মন্ত্রণালয়সহ সরকারের উচ্চপর্যায়ের সাথে সম্পর্কিত মক্কায় বসবাসরত একজন প্রবাসী বাংলাদেশীর কাছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, সৌদি সরকার এখন ভাইরাসটির বিস্তার যাতে না ঘটে সে দিকেই বেশি নজর দিচ্ছে। ওমরাহ বন্ধ করে দেয়া তারই অংশ। হজের জন্য এখনো হাতে সময় থাকায় এ ব্যাপারে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত আরো পরে নেয়া হতে পারে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এই প্রবাসী আরো জানান, সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, হজের সময় সৌদি আরবে তাপমাত্রা ৪৫ থেকে ৫০ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত হতে পারে। প্রচণ্ড গরমের কারণে তখন করোনা বিস্তারের আশঙ্কা কম। ততদিন পর্যন্ত পরিস্থিতি সৌদি আরবে নিয়ন্ত্রণে চলে আসবে। তবে বহির্বিশ্বে করোনা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে না এলে বাইরের লোকদের সৌদি আরবে প্রবেশের অনুমতি সৌদি সরকার কোনোভাবেই দেবে না। সে ক্ষেত্রে বাইরের লোকদের জন্য হজ বন্ধ রেখে সৌদি আরবে বসবাসরদের জন্য সীমিত আকারে হজের অনুমতি দেয়া হতে পারে।
এই প্রবাসী আরো জানান, চীনের পর ইরান এবং সর্বশেষ ইতালিসহ অন্যান্য দেশে করোনা যেভাবে ছড়াচ্ছে তাতে আসন্ন রমজানে মসজিদুল হারামাইনে এতেকাফসহ ওমরাহর অনুমতি দেয়ার সম্ভাবনা নেই। রমজানের আগে এপ্রিল মাসের শেষের দিকে হজের ব্যাপারেও চূড়ান্ত ঘোষণা আসতে পারে।

আরব নিউজের খবরে বলা হয়েছে, সৌদি স্বাস্থ্যমন্ত্রী ডা: তৌফিক আল-রাবিয়াহ গত সোমবার করোনভাইরাস মোকাবেলার বিষয়ে অবহিত করতে গিয়ে গণমাধ্যমকে বলেছেন, এ ধরনের পরিস্থিতি মোকাবেলার মাধ্যমে হজ ও ওমরাহ পরিচালনার জন্য সরকার অভিজ্ঞতা ও দক্ষতা অর্জন করছে। ‘দ্য নিউ আরবের’ এক প্রতিবেদনে বলা হয় সৌদি আরবে ওমরাহ বন্ধ করা এবং করোনাভাইরাস আক্রান্তের সংখ্যা বৃদ্ধির পরিপ্রেক্ষিতে হজের সময় কী হবে তা নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিচ্ছে। করোনাভাইরাসের প্রাদুর্ভাব কমার কোনো লক্ষণ এখনো নেই। ফলে অনেকে হজ বাতিলের আশঙ্কা করছেন।
সংবাদমাধ্যমটির ওই প্রতিবেদনে আরো বলা হয়, ইসলামের ইতিহাসে এর আগেও বহুবার রোগ, সঙ্ঘাত, দস্যু ও আক্রমণকারীদের তৎপরতা বা অন্যান্য কারণে হজ বাতিল করা হয়েছে এবং এই হিসেবে হজ বন্ধ করা নিয়ে মানুষের আশঙ্কা একেবারেই অমূলক নয়।
এতে আরো বলা হয়, সম্প্রতি সৌদি কিং আব্দুল আজিজ ফাউন্ডেশন ফর রিসার্চ অ্যান্ড আর্কাইভস ইতিহাসে ৪০ বার হজ বাতিল করা হয়েছিল বা হজযাত্রীর সংখ্যা অত্যন্ত কম ছিল উল্লেখ করে একটি বিবৃতি প্রকাশ করেছে।

এ দিকে ফিলিস্তিনভিত্তিক ‘মিডল ইস্ট আই’ নামক একটি পত্রিকায় ওমরাহ বন্ধ করার পর হজ নিয়েও ফিলিস্তিনিদের শঙ্কার কথা জানিয়ে বলা হয়, ওমরাহ বন্ধের পর হাজার হাজার ফিলিস্তিনি সৌদি আরবের পবিত্র স্থানগুলো দর্শনের পরিকল্পনা বাদ দিয়েছে। এখন আগামী জুলাই মাসে অনুষ্ঠেয় হজের ব্যাপারেও তাদের মধ্যে প্রশ্ন বৃদ্ধি পাচ্ছে। ‘নিউজ ২৪’ এর খবরে ‘করোনাভাইরাস বৃদ্ধির পরিপ্রেক্ষিতে আসন্ন হজ নিয়ে শঙ্কা’ শিরোনামের খবরে বলা হয়েছে, দক্ষিণ আফ্রিকান হজ ওমরাহ কাউন্সিল (সাহুক) তাদের ফেসবুক পেইজে সৌদি ধর্ম মন্ত্রণালয়ের পরবর্তী নির্দেশনা না আসা পর্যন্ত হজের প্রশাসনিক কার্যক্রম বন্ধ রাখার জন্য বলেছে।

শেখ যাকারিয়া ইসলামিক রিসার্চ ইনস্টিটিউটের মহাপরিচালক মুফতি মিজানুর রহমান সাঈদের কাছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, হজের আগেই করোনা পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়ে যাকÑ এই কামনা আমরা করি। এখনো যেহেতু সময় আছে, হজ স্থগিত হবে এমন কথা না বলাই ভালো। হজের প্রস্তুতি চলতে থাকুক।
তিনি বলেন, মহামারী বা এই ধরনের পরিস্থিতি তৈরি হলে আক্রান্ত এলাকা থেকে অন্য এলাকায় এবং আক্রান্ত এলাকায় না যাওয়ার ব্যাপারে রাসূল সা: হাদিসে পরিষ্কারভাবে বলেছেন। ফলে সৌদি সরকার হজের জন্য হাজীদের প্রবেশে নিষেধ করার অবকাশ আছে। তিনি বলেন, হজজীবনে একবার ফরজ। ফলে আর্থিকভাবে সামর্থ্যবান হওয়ার পর ব্যক্তির ওপর ফরজ হয়ে যাবে। এখন আদায়টা বাকি থাকবে। তিনি এ বছর আদায় করতে না পারলে পরের বছর আদায় করবেন। এ বছর আদায় করতে না পারা কেউ যদি মৃত্যুর মুখোমুখি হয়ে পড়েন তাহলে তিনি তার উত্তরাধিকারীদের কাছে হজ করার জন্য ওসিয়ত করে যাবেন এবং সে অনুযায়ী পরবর্তীতে সেটি পালন করলে আদায় হয়ে যাবে।

এই ইসলামী গবেষক আরো বলেন, সামর্থ্যবানদের ওপর আল্লাহ হজ ফরজ করেছেন। এখন যাওয়ার পথ এবং যেখানে গিয়ে হজ পালন করবেন সেই স্থান নিরাপদ না হলে, জীবনহানি বা রোগে আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কা থাকলে বা শত্রু দ্বারা আক্রান্ত হওয়ার ভয় থাকলে হজ বিলম্বিত করায় কেউ গুনাহগার হবেন না।

মধ্যপ্রাচ্য বিশেষজ্ঞ ও গবেষক ড. মুহাম্মদ এনামুল হক চৌধুরী এ ব্যাপারে বলেন, ইতিহাসে হজ বন্ধ থাকার নজির আছে। হিজরতের নবম বছরে হজ পালন ফরজ ইবাদত হিসেবে ঘোষিত হওয়ার পর থেকে এ যাবৎ আংশিক বা সম্পূর্ণরূপে ৪০ বার হজ স্থগিত হয়েছিল। যার মধ্যে ১২ বার স্থগিত করা হয়েছিল সম্পূর্ণরূপে। করোনাভাইরাসের কারণে হজ ও ওমরাহ ২০২০ সালে স্থগিত হওয়া অসম্ভব নয়, কিন্তু তা নির্ভর করবে এই রোগের সংক্রমণ আন্তর্জাতিকভাবে নিয়ন্ত্রণে আনার ওপর।

ইতিহাসে অনেকবার হজ বন্ধ কিংবা সীমিত করা হলেও ১৯৩২ সালের পর একেবারেই হজ বন্ধ থাকার কোনো ঘটনা ঘটেনি বলে একটি পত্রিকার খবরে বলা হয়।
সৌদি আরবে বাংলাদেশ হজ মিশনের কনসাল জেনারেল (হজ) মাকসুদুর রহমানের কাছে হজ স্থগিত হওয়ার ব্যাপারে জানতে চাইলে তিনি কোনো মন্তব্য করেননি।
ধর্ম মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা বলছেন, হজের প্রস্তুতি অব্যাহত থাকবে। সৌদি সরকার যে সিদ্ধান্ত নেবে তার আলোকে সরকারও ব্যবস্থা নেবে।
প্রসঙ্গত, করোনাভাইরাস ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কায় সৌদি সরকার গত ২৭ ফেব্রুয়ারি থেকে বিদেশী নাগরিকদের ওমরাহ পালনের ওপর সাময়িক নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে। ৩ মার্চ থেকে ওমরাহ পালন সম্পূর্ণ বন্ধ করে দিয়ে বিশেষ পরিচ্ছন্নতা অভিযান পরিচালনা শুরু করা হয়। সেই থেকে কাবা শরিফে মুসল্লিদের প্রবেশে নিয়ন্ত্রণ আরোপ করে বর্তমানে সীমিত আকারে ফজরের নামাজের পর থেকে এশার নামাজ পর্যন্ত মাতাফের (মূল তাওয়াফের স্থান) নির্ধারিত সীমা দিয়ে শুধু তাওয়াফের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। অন্য দিকে করোনা পরিস্থিতিতে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা কর্তৃক মহামারী ঘোষণা এবং এর সংক্রমণ সৌদি আরবসহ বিশ্বব্যাপী আরো বৃদ্ধি পাওয়ার কারণে হজ স্থগিত করার বিষয়টি আরো জোরালোভাবে আসছে।

আগামী ৩০ জুলাই হজের সম্ভাব্য তারিখ এবং বাংলাদেশ আগামী ২৩ জুন থেকে হজ ফ্লাইট পরিচালনার কথা। বাংলাদেশেও হজ এজেন্সি এবং হজযাত্রীদের মধ্যে হজ না হওয়ার শঙ্কা বিরাজ করছে। এ কারণেই গত ১ মার্চ থেকে শুরু হওয়া হজের নিবন্ধনে একেবারেই ধীরগতি লক্ষণীয়। এ বছরের এক লাখ ৩৮ হাজার ১৯৮জন হজযাত্রীর কোটার মধ্যে গতকাল পর্যন্ত মাত্র ১৬ হাজার ৪৮ জন নিবন্ধন করেছেন, যা মোট হজযাত্রীর ১২ শতাংশের একটু বেশি। প্রথম দফায় নিবন্ধনের সময় দেয়া হয়েছিল ১৫ মার্চ। পরে তা ১০ দিন বৃদ্ধি করে ২৫ মার্চ করা হয়েছে।
হজ এজেন্সিজ অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (হাব) সভাপতি এম শাহাদাত হোসাইন তসলিমের কাছে এ ব্যাপারে জানতে চাইলে তিনি এ জন্য হজযাত্রীদের পাসপোর্ট পেতে বিলম্ব হওয়া এবং সময়মতো টাকা পরিশোধ করতে না পারাকে কারণ হিসেবে উল্লেখ করেন। হজ স্থগিত হওয়ার আশঙ্কার ব্যাপারে তিনি এখনই কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।
হাবের যুগ্ম সম্পাদক মাওলানা ফজলুর রহমান বলেন, হজ হওয়া না হওয়া নিয়ে হজযাত্রী এমনকি এজেন্সিগুলোর মধ্যেও একটি শঙ্কা কাজ করছে। ফলে হজযাত্রীরা যেমন দ্বিধাদ্বন্দ্বে রয়েছেন অনেক এজেন্সি মালিকও বিষয়টি নিয়ে চিন্তিত।

হাবের আরেক কর্মকর্তা বলেন, করোনার কারণে অনেকে আগামী বছর হজ করার চিন্তা করছেন। কারণ এ বছরের জন্য যারা প্রাক নিবন্ধন করেছেন তাদের আগামী বছরও যাওয়ার সুযোগ থাকবে।
হজ ব্যবস্থাপনার সাথে জড়িত মাওলানা খুরশিদ আলম বলেন, আমার শতাধিক হজযাত্রীর মধ্যে মাত্র ১০ থেকে ১২ জন নিবন্ধনের জন্য টাকা জমা দিয়েছেন। নানা কথা বলে টাকা দিতে দেরি করছেন। সরাসরি এ বছর যাবেন নাÑ এটাও বলছেন না। আমরা বুঝতে পারছি করোনাভাইরাসের ভয়ে হজযাত্রীরা সিদ্ধান্ত নিতে পারছেন না। অনেকে পরিস্থিতি বোঝার চেষ্টা করছেন।