চট্টগ্রাম বিভাগ

ওসি মোয়াজ্জেমের যত কুকীর্তি

শেয়ার করুন

ফেনীর সোনাগাজী মডেল থানা থেকে প্রত্যাহারের পর বরখাস্ত হওয়া ওসি মো: মোয়াজ্জেম হোসেন দেশজুড়ে বিতর্কিত। তাকে শাস্তিমূলক রংপুরে সংযুক্ত করা হলেও সেখানকার ছাত্রসমাজ তাকে জুতা প্রদর্শন করে অবাঞ্ছিত ও প্রতিহতের ঘোষণা দিয়েছে। মাদরাসা ছাত্রী নুসরাত জাহান রাফিকে বর্বরোচিত হত্যার পর আত্মহত্যা বলে চালিয়ে দেয়ার চেষ্টার ঘটনায় পুলিশ বিভাগের ভাবমূর্তি ক্ষুন্ন হয়েছে বলে পুলিশ সদর দপ্তরের প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। তার এ কেলেঙ্কারি নতুন কিছু নয়, এর আগেও ফেনী মডেল থানা ও ছাগলনাইয়া থানা থেকে প্রত্যাহার হন অর্থলোভি এ পুলিশ কর্মকর্তা। কুমিল্লার একাধিক থানায় কর্মরত থাকাকালীনও তার বিরুদ্ধে রয়েছে অভিযোগের স্তুপ।

২০১৩ সালে শহরের ট্রাংক রোডের সুপার মার্কেটের এক ব্যবসায়ীকে থানায় ধরে নিয়ে ১ লাখ টাকা চাঁদা আদায় করেন তৎকালীন ওসি মো: মোয়াজ্জেম হোসেন। ঘটনাটি পত্রপত্রিকায় প্রকাশিত হলে তোলপাড় শুরু হয়। তদন্তে ঘটনার সত্যতা মেলায় একজন এসআইকে প্রত্যাহার করা হয়। কিছুদিন পর জামায়াত কানেকশানের তথ্য ফাঁসের পর ফেনী ছাড়তে বাধ্য হন তিনি। অভিযোগ ছিল- অর্থের বিনিময়ে কর্মসূচী পালনের সুযোগ দিয়ে পেছনে পুলিশ পাঠিয়ে তৎপর হয়ে উঠতেন ওসি।

২০১৩ সালের ১৪ ডিসেম্বর ছাগলনাইয়া থানায় যোগদান করেন। এখানে ৩২টি স্বর্ণের বারসহ ফটিকছড়ির মোর্শেদকে আটক করা হয়। ১২টি স্বর্ণের বার জব্দ তালিকায় দেখিয়ে ২০টি বার আত্মসাত করার চেষ্টা চালান তিনি। খবর পেয়ে থানায় যান অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মো. সাইফুল হক। তিনি চোরাকারবারী মোর্শেদের দেহতল্লাশি করে আরো ২০টি স্বর্ণের বার উদ্ধার করেন। ওসি মোয়াজ্জেম স্বর্ণ চুরির বিষয়টি ধামাচাপা দেয়ার চেষ্টা চালিয়ে ব্যর্থ হন।

পশ্চিম দেবপুরে বোমা বিস্ফোরনে শিশু আলম আহতের ঘটনায় উল্টো তার পরিবারের বিরুদ্ধে মিথ্যা মামলা করা নিয়ে এলাকায় চরম উত্তেজনা দেখা দেয়। প্রতিপক্ষের কাছ থেকে মোটা অংকের ঘুষ নিয়ে ওসি মোয়াজ্জেম নিরীহ শিশুর পরিবারকে মামলার জালে আটকে দেয়। যা পত্রিকায় প্রকাশের পর পুলিশ সুপারের নজরে পড়লে তার নির্দেশে অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মো. সাইফুল হক সরেজমিন তদন্ত করলে আসল ঘটনা বেরিয়ে আসে। একপর্যায়ে আহত শিশুর পরিবারের পক্ষ থেকে দেয়া মামলা নিতে বাধ্য হয় ওসি মোয়াজ্জেম।

গত ৩১ আগস্ট রাতের অন্ধকারে প্রতিপক্ষের কাছ থেকে ওসি ঘুষ নিয়ে নবদম্পতিকে আটক করতে গিয়ে তার নির্দেশে পুলিশ নিচিন্তা গ্রামে লঙ্কাকান্ড ঘটায়। বয়োবৃদ্ধের চুলের মুড়ি ধরে টেনে-হেঁচড়ে গালে চড় মারার ঘটনায় এলাকায় অসন্তোষ ছড়িয়ে পড়ে। ক্ষিপ্ত ওসি ওই ঘটনায় নিরীহ লোকজনকে আসামি করে মিথ্যা মামলায় ফাঁসিয়ে দেয়। দারোগাবাজার এবং নিজপানুয়া থেকে দুই প্রবাসীকে মামলার ভয় দেখিয়ে ৬০ হাজার টাকা লুটে নেয়ার ঘটনাও এলাকায় তোলপাড় শুরু হয়। জুতা পালিশ করে মুচির টাকা না দেয়ার ঘটনাও দাগ কাটে শহরের ব্যবসায়ীদের মনে। সর্বশেষ থানা রাস্তা সরু করে দোকান বাণিজ্যের ঘটনায় ওসি মোয়াজ্জেম চরম বেকায়দায় পড়েন।

তৎকালীন নতুন পুলিশ সুপার রেজাউল হক পিপিএম যোগদানের পর থেকে ওসি মোয়াজ্জেমের বিরুদ্ধে একের পর এক অভিযোগ তার কাছে জমা পড়ে। ধারাবাহিক প্রতিবেদন ছাপা হয় বিভিন্ন পত্রিকায়। এসপি যোগদানের পর প্রথম ছাগলনাইয়া থানায় ওপেন হাউস ডে সভায় ওসি মোয়াজ্জেমের মুখোশ উন্মোচন হয়ে পড়ে। এসপির নজরে আসে ওসির অপকর্মের আসল চিত্র। কয়েক মাস ধরে ওসির প্রত্যাহার এবং তার শাস্তির দাবিতে ছাগলনাইয়া ফুঁসে ওঠে সাধারণ জনগণের পাশাপাশি খোদ আওয়ামীলীগ নেতাকর্মীরাও।

মহামায়া ইউনিয়ন আওয়ামীলীগের নেতাকর্মীরা ওসির শাস্তির দাবিতে ছাগলনাইয়া-পরশুরাম সড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ মিছিল-সমাবেশ ও সাংবাদিক সম্মেলন করেছিলেন। তার নির্যাতনের শিকার নিচিন্তা গ্রামের নিরীহ হাজার হাজার লোকজন তার বিরুদ্ধে স্থানীয় সংসদ সদস্য শিরীন আখতারের কাছে একাধিকবার নালিশ দিয়ে তার শাস্তির দাবি করেন। লিখিত অভিযোগ করেন খোদ স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী বরাবর। একপর্যায়ে তাকে ছাগলনাইয়া থেকে প্রত্যাহার হন।

দীর্ঘদিন পুলিশ লাইনে ও পরবর্তীতে কুমিল্লা বদলী হওয়ার পর ২০১৮ সালের শুরুতে সোনাগাজী মডেল থানায় যোগ দিলে স্থানীয় আওয়ামীলীগ নেতারা তার ঘুষ-দুর্নীতির প্রতিবাদে মাঠে নামেন। কোনো প্রতিকার না পেয়ে তারাও চুপসে যান। তবে তার সময়কালীন সময়ে সোনাগাজী চুরি-ডাকাতি-চাঁদাবাজি-ধর্ষণ অন্য সময়ের তুলনায় বেড়ে যায়। চোর-ডাকাত, মাদক বিক্রেতা সহ অপরাধীদের সাথে তার গভীর সখ্য ছিলো বলে অভিযোগ রয়েছে।

এর আগে কুমিল্লায় কর্মরত থাকাকালীন তার বিরুদ্ধে আওয়ামীলীগ নেতাদের অভিযোগ প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় পর্যন্তও গড়িয়েছে। তিনি নিজেকে আওয়ামী লীগের এক কেন্দ্রীয় নেতার নিকটাত্মীয় পরিচয় দিলেও আওয়ামীলীগ নেতারা বলছেন- এর কোনো সত্যতা নেই।

সূত্রঃ নয়া দিগন্ত