আর্ন্তজাতিক

অর্থনীতি সচলের প্রথম পদক্ষেপ নিয়েছে ভিয়েতনাম

শেয়ার করুন
 

বিডি রিপোর্ট টোয়েন্টিফোর ডটকম :

জানুয়ারির শেষদিকে প্রতিবেশী চীন থেকে আসা দুজন ব্যক্তির শরীরে করোনাভাইরাস ধরা পড়ার মধ্য দিয়ে ভিয়েতনামে প্রবেশ ঘটে এই ভাইরাসের। এমন পরিস্থিতিতে দেশটির কমিউনিস্ট পার্টি নেতৃত্বাধীন সরকার যে ধরনের নিয়ন্ত্রণ আরোপ করে, তা অনেক গণতান্ত্রিক দেশের জন্যই কঠিন হতো। পরবর্তী কয়েক সপ্তাহে কার্যত অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক সব ফ্লাইট নিষিদ্ধ, ঠাণ্ডার ওষুধ কিনলে ফার্মেসিগুলোকে খবর দেয়ার নির্দেশ এবং এক লাখের বেশি মানুষজনকে সেনা ক্যাম্প, হোটেল ও বাড়িতে কোয়ারেন্টিনে রাখা হয়। খবর ভিয়েতনাম ইনসাইডারের।

২২ বছর বয়সী এনগুয়েন দুক হিউ নামের এক শিক্ষার্থী বলেন, তিনি গত মার্চে লন্ডন থেকে ফেরার পর তাকে জোর করে কোয়ারেন্টিনে পাঠানো হয়। হো চি মিন শহরে যাওয়ার পথে বিমানের পাইলট যাত্রীদের বলেন যে, প্লেনটি এখন মেকং ডেল্টার দিকে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে কারণ সেখানকার সব কোয়ারেন্টিন ফ্যাসিলিটি পূর্ণ হয়ে গেছে।পরে যাত্রীদের সেনাবাহিনীর গাড়িতে করে একটি সেনা স্কুলে নিয়ে যাওয়া হয়; অস্থায়ী ওই কোয়ারেন্টিন ক্যাম্পে তাদের দুই সপ্তাহ রাখা হয়।হিউ বলেন, একটি রুমে আমরা ছয়-আটজন ছিলাম, সেখানে বাঙ্ক বেড ও সেনাবাহিনীর কম্বল ছিল। আমাদের টুথব্রাশ, টুথপেস্ট, বালিশ ও মশারির মতো কিছু প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র দেয়া হয়। যদিও এটা অস্বস্তিকর ছিল, কিন্তু আমি মনে করি এটা দরকার ছিল।

শূন্য মৃত্যু :

কঠোর নিয়ন্ত্রণ কাজ করেছে বলে মনে হচ্ছে। দেশটিতে করোনায় আক্রান্ত হয়েছে মাত্র ২৭০ জন এবং কোনও মৃত্যু হয়নি। এমন পরিস্থিতিতে দেশের অধিকাংশ এলাকায় লকডাউন শিথিল করে কিছু ব্যবসা পুনরায় চালুর অনুমতি দিয়েছে ভিয়েতনামের কর্তৃপক্ষ।তবে সংক্রমিতের এত কম সংখ্যা নিয়ে সন্দেহ রয়েছে, কেননা ২১ এপ্রিল পর্যন্ত প্রতি ১০ লাখে মাত্র এক হাজার ৮৮১ জনের পরীক্ষা করছে ভিয়েতনাম, যেখানে সিঙ্গাপুরের ক্ষেত্রে এটি সাড়ে ১৪ হাজার। তবু সিঙ্গাপুর এবং ইন্দোনেশিয়ায় যেখানে সংক্রমণ বেড়ে যাওয়ায় বিধিনিষেধ বাড়াতে হয়েছে, সেখানে নিজেদের পদক্ষেপের জন্য যুক্তরাষ্ট্রের সেন্টারস ফর ডিজিজ কন্ট্রোল অ্যান্ড প্রিভেনশন এবং বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার প্রশংসা কুড়িয়েছে ভিয়েতনাম।হো চি মিন শহরের বেকার ম্যাকিনজি ল’ ফার্মের ম্যানেজিং পার্টনার ফ্রেড বুর্ক বলেন, ভিয়েতনাম সার্স, বার্ড ফ্লু এবং বিভিন্ন ধরনের অর্থনৈতিক সঙ্কটের ভেতর দিয়ে গেছে। তারা বুঝতে পেরেছে যে, তাদের দ্রুত এবং পদ্ধতিগতভাবে প্রতিক্রিয়া দেখাতে হবে। দেশটির অর্থনীতি পুনরায় সচল হওয়া এখন সময়ের ব্যাপার মাত্র।

বাণিজ্যযুদ্ধে জয়ী :

যুক্তরাষ্ট্র ও বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনীতির দেশ চীনের মধ্যে বাণিজ্যযুদ্ধের প্রেক্ষিতে উৎপাদনের বিকল্প হাব হিসেবে ইতোমধ্যে বিদেশি বিনিয়োগকারীদের পছন্দের তালিকায় রয়েছে ভিয়েতনাম।এই সুযোগটা কাজে লাগাতে যাচ্ছে ভিয়েতনামের সরকার। দেশটির পরিকল্পনা ও বিনিয়োগ মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, গত বছর দেশটিতে সরাসরি বিদেশি বিনিয়োগের প্রতিশ্রুতি ৭.২% বৃদ্ধি পেয়েছে, এর মধ্যে উৎপাদন খাতেই ২৪.৬ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগের প্রতিশ্রুতি এসেছে। এর ফলে ২০০৭ সালের পর দ্বিতীয় সর্বোচ্চ গতিতে ভিয়েতনামের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ৭.০২% এ দাঁড়িয়েছে।হ্যানয় ভিত্তিক একজন অর্থনীতিবিদ এবং সরকারের একজন সাবেক উপদেষ্টা লি ড্যাং ডোয়ান বলেছেন, এটা আমাদের রাজনৈতিক ব্যবস্থা সুবিধা, যার ফলে যখন কোনও শত্রুর বিরুদ্ধে লড়াইয়ের প্রয়োজন পড়ে তখন সরকার প্রয়োজনীয় সবকিছু করতে পারে এবং এবার এটি ছিল করোনাভাইরাস।ইউএস-আসিয়ান বিজনেস কাউন্সিলের একজন সিনিয়র ভিয়েতনামি প্রতিনিধি ভু তু থান বলেছেন, চীনের ভাইরাসের প্রভাব- এছাড়া বয়স্ক জনগোষ্ঠীর কারণে সেখানে বিদেশি কোম্পানির ব্যয় বেড়ে যাচ্ছে, যার ফলে ভিয়েতনাম বিদেশিদের কাছে আরও বেশি আকর্ষণীয় হয়ে উঠছে।থান বলেন, গ্রুপের করপোরেট সদস্যের ওপর পরিচালিত এক জরিপে দেখা গেছে তারা চীনে তাদের অবস্থান পুনর্মূল্যায়ন করছে।

এখনও ঝুঁকি আছে :

চলতি বছরের প্রথম তিন মাসে ভিয়েতনামে ৮৪৮ মিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করে সেখানকার দ্বিতীয় বৃহত্তম বিনিয়োগকারী জাপান এ মাসের শুরুর দিকে জানায়, তারা চীন থেকে তাদের উৎপাদন সরিয়ে নিতে উৎপাদনকারীদের জন্য ২.২ বিলিয়ন ডলারের একটি অর্থনৈতিক প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করেছে। বিদেশি বিনিয়োগ প্রশাসন প্রক্রিয়া সংশোধনের বিষয়ে সরকারকে পরামর্শ কাউন্সিলের সদস্য বুর্ক বলেন, এর মাধ্যমে ভিয়েতনাম লাভবান হবে।তবে ভিয়েতনাম এখনও ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে বলে জানিয়েছেন দেশটির কর্মকর্তারা।

শুক্রবার দেশটির ডেপুটি প্রধানমন্ত্রী ভু ডুক ডাম, যিনি ন্যাশনাল স্টিয়ারিং কমিটি অন করোনাভাইরাস প্রিভেনশন অ্যান্ড কন্ট্রোলের চেয়ারম্যান, সতর্ক করে দিয়ে বলেছেন, এখনও বড় ধরনের ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে ভিয়েতনাম।এছাড়া বৈশ্বিক চাহিদার ক্ষেত্রে মন্দা দেখা দেবে সেটির ধাক্কাও আছে। নাইকি ইনক. সু থেকে এলজি ইলেকট্রনিক্স ইনক.-র মতো হোম অ্যাপ্লায়েন্সের অর্ডার বৃদ্ধি না পেলে কারখানাগুলো পুরোদমে অর্ডার পাবে না।বিশ্ব ব্যাংক বলছে, ভিয়েতনাম রপ্তানি ওপর খুব নির্ভরশীল, দেশটির জিডিপর ১০০ শতাংশের বেশি আসে রপ্তানি খাত থেকে। তাই প্রথম তিন মাসে প্রবৃদ্ধি কমে ৩.৮২% এ দাঁড়িয়েছে।

আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল বলছে, পুরো বছরের জন্য এটি ২.৭% হতে পারে।এদিকে বিধিনিষেধ উঠে গেলেই যে জীবন স্বাভাবিক হয়ে আসবে, তা নয়। লন্ডনভিত্তিক ক্যাপিটাল ইকনোমিকস লিমিটেডের একজন অর্থনীতিবিদ গ্যারেথ লেদার বলছেন, প্রথমত পুরোপুরি লকডাউন তুলে নেয়া হচ্ছে না। এছাড়া সঙ্কটের আগে অভ্যাসে সহসাই ফিরবে না মানুষজন। ভাইরাসে আক্রান্ত হতে পারেন এমন ভয়ে আরও কিছুদিন মানুষজন সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখবে।৯ কোটি ৬০ লাখ জনগোষ্ঠীর দেশটিতে দীর্ঘ সারিতে দাঁড়িয়ে বিনামূল্যে ‘চালের এটিএম’ থেকে খাদ্য সংগ্রহের বিষয় পরিস্থিতির ভয়াবহতা ফুটিয়ে তুলেছে। যাদের ছুটিতে পাঠানো হয়েছে বা চাকরি হারিয়েছেন এমন মানুষ বিনামূল্যে খাবার সংগ্রহ করছেন।তবে ভিয়েতনামের সরকার বিশ্বাস করে তাদের কঠোর পদক্ষেপের কারণে অর্থনীতি বড় ধরনের ক্ষতি থেকে বেঁচে গেছে।

হ্যানয়ের মেকং ইকনোমিকসের প্রধান অর্থনীতিবিদ অ্যাডাম ম্যাককার্টি বলছেন, কারখানাগুলো বৈশ্বিক চাহিদা ফিরে আসার জন্য অপেক্ষা করলেও, দেশীয় অর্থনীতি গতি ফিরে পেতে শুরু করবে।তিনি বলেন, যেভাবে ভিয়েতনাম এই ভাইরাস মোকাবিলা করেছে তা এটা নির্দেশ করে যে তারা আর উন্নয়নশীল দেশ নয়। তারা দেখিয়েছে তাদের উন্নত ব্যবস্থার মাধ্যমে তারা সমস্যা মোকাবিলায় সক্ষম।