SHARE

আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন ১৪ দলীয় জোট সরকারের চার বছর পূর্তি হচ্ছে শুক্রবার। শনিবার পঞ্চম বছরে পা দিতে যাচ্ছে বর্তমান সরকার। টানা দ্বিতীয় মেয়াদে ক্ষমতায় আসা সরকারের চার বছরে উন্নয়ন-অর্জন-অগ্রগতির পাল্লা অনেক ভারী।

সরকারের চার বছর পূর্তি উপলক্ষে শুক্রবার জাতির উদ্দেশে ভাষণ দেবেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।

২০০৮ সালের ২৯ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত নবম সংসদ নির্বাচনে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জনের পর ২০০৯ সালের ৬ জানুয়ারি দিনবদলের অঙ্গীকার নিয়ে এই সরকার যাত্রা শুরু করে। এরপর ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জয়ী হয়ে টানা দ্বিতীয় মেয়াদে সরকার গঠন করে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন ২০ দলীয় জোট।

গত চার বছরে সরকারের সফলতা-ব্যর্থতা কতটুকু তার প্রতিফলন দেখা যাবে আগামী জাতীয় নির্বাচনে। সে পর্যন্ত অপেক্ষার পালা।

বাংলাদেশের অর্থনীতি এখন প্রায় ৮ লাখ কোটি টাকার বেশি, যা জিডিপির ভিত্তিতে বিশ্বে ৪৪তম এবং ক্রয়ক্ষমতার ভিত্তিতে ৩২তম। সরকার ধারাবাহিকভাবে ৬.৫ শতাংশ হারে প্রবৃদ্ধি ধরে রেখে পুরো বিশ্বের কাছে উন্নয়নের রোল মডেল হিসেবে স্বীকৃতি লাভ করেছে। ২০১৫-১৬ অর্থবছরে জিডিপি প্রবৃদ্ধির হার ছিল ৭.১১ শতাংশ। ২০১৬-১৭ তে প্রবৃদ্ধি ৭ দশমিক ২৮ শতাংশ। প্রাইস ওয়াটার হাউস কুপার্সের প্রতিবেদন অনুযায়ী, বাংলাদেশ ২০৩০ সাল নাগাদ বিশ্বের ২৯তম ও ২০৫০ সাল নাগাদ ২৩তম অর্থনীতির দেশে উন্নীত হবে।

২০০৫-০৬ সালে জনগণের মাথাপিছু আয় ৫৪৩ মার্কিন ডলার থেকে বৃদ্ধি পেয়ে বর্তমানে ১ হাজার ৬১০ ডলারে উন্নীত হয়েছে। দারিদ্র্যের হার ২০০৫-০৬ সালে ছিল ৪১.৫ শতাংশ। এখন তা হ্রাস পেয়ে হয়েছে ২২.৪ শতাংশ। অতি দারিদ্র্যের হার ২৪.২৩ থেকে ১২ শতাংশে নেমে এসেছে।

সরকারের লক্ষ্য- ২০২১ সালের মধ্যে দারিদ্র্যের হার ১৫-১৬ শতাংশে এবং অতি দারিদ্র্যের হার ৭-৮ শতাংশে নামিয়ে আনা। দেশের ৫ কোটি মানুষ নিম্নবিত্ত থেকে মধ্যবিত্ত শ্রেণিতে উন্নীত হয়েছে।

সার্বিক উন্নয়নের লক্ষ্যে ষষ্ঠ পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা বাস্তবায়ন ইতোমধ্যে শেষ হয়েছে। সপ্তম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা বাস্তবায়নের কাজ শুরু হয়েছে।

বাংলাদেশের অর্থনীতি আজ শক্ত ভিত্তির ওপর প্রতিষ্ঠিত। ২০০৫-০৬ অর্থবছরে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ছিল মাত্র ৩.৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলার, যা বর্তমানে ৩৩.০৪ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের ওপরে। ২০০৫-০৬ অর্থবছরে রপ্তানি আয় ছিল মাত্র ১০.৫২ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। ২০১৫-১৬ অর্থবছরে তা বৃদ্ধি পেয়ে ৩৪.২৪ বিলিয়ন মার্কিন ডলারে উন্নীত হয়েছে।

দেশ-বিদেশে মানুষের কর্মসংস্থানের হার বেড়েছে। সরকারের টানা দ্বিতীয় মেয়াদে একদিকে মানুষের ক্রয়ক্ষমতা বেড়েছে, অন্যদিকে মূল্যস্ফীতি সহনীয় পর্যায়ে থাকায় মানুষের জীবনমানের উন্নয়ন হয়েছে।

সরকার বিদ্যুৎ খাতে অভূতপূর্ব উন্নয়ন সাধন করেছে। ২০০৯ সালে দেশে বিদ্যুৎ উৎপাদন ছিল ৩ হাজার ২০০ মেগাওয়াট। বর্তমানে বিদ্যুৎ উৎপাদন প্রায় ১৬ হাজার ১৪৯ মেগাওয়াট। দেশের ৮০ শতাংশের বেশি মানুষ বিদ্যুৎ সুবিধার আওতায় এসেছে।

পদ্মা সেতু, মেট্রোরেল, রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ প্রকল্প, গভীর সমুদ্র বন্দরসহ অন্যান্য মেগাপ্রকল্পগুলো বাস্তবায়নের লক্ষ্যে এগিয়ে চলছে সরকার।

কৃষি খাতে ব্যাপক অগ্রগতি সাধিত হয়েছে। সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনীর আওতায় সামাজিক ক্ষেত্রে ব্যাপক সংখ্যক সুবিধাভোগী মানুষ আওতাভুক্ত হয়েছে। যোগাযোগ খাতে নজরকাড়া উন্নয়ন সাধন করেছে। বিমানবন্দর থেকে মতিঝিল পর্যন্ত ২৬ কিলোমিটার এক্সপ্রেসওয়ে নির্মাণের কাজ এগিয়ে চলছে। প্রায় ৯ কিলোমিটার দীর্ঘ মগবাজার-মৌচাক ফ্লাইওভার উদ্বোধন করা হয়েছে। মেট্রোরেল নির্মাণের কাজও শুরু হয়েছে। ঢাকা-চট্টগ্রাম সড়ক চার লেন হয়েছে। নবীনগর-ডিইপিজেড-চন্দ্রা সড়ক এবং ঢাকা-ময়মনসিংহ সড়ক চার লেনে উন্নীত করা হয়েছে। চন্দ্রা-টাঙ্গাইল মহাসড়ক এবং ঢাকা-সিলেট মহাসড়ক চার লেনে উন্নীত করার কাজ চলছে। যাত্রাবাড়ী থেকে কাঁচপুর পর্যন্ত দেশের প্রথম আট লেনের মহাসড়ক চালু করা হয়েছে। নিজস্ব অর্থায়নে পদ্মা সেতু নির্মাণকাজও দ্রুত এগিয়ে যাচ্ছে। রেলওয়ে আধুনিকায়নের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। আগামীতে ইলেকট্রিক ট্রেন ও পাতাল ট্রেনের সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের কাজ চলছে। এছাড়াও রাজধানী ঢাকার চারদিকে সার্কুলার ট্রেনের সম্ভাব্যতা যাচাই চলছে। ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়ার প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে অভূতপূর্ব পরিবর্তন সাধিত হয়েছে। ২৫ হাজারেরও বেশি ওয়েবসাইট নিয়ে বিশ্বের বৃহত্তম ওয়েব পোর্টাল ‘তথ্য বাতায়ন’চালু করা হয়েছে। মহেশখালীতে শেখ হাসিনা সফটওয়্যার টেকনোলজি পার্ক স্থাপন করা হয়েছে।

প্রতিটি ক্ষেত্রে উন্নয়ন-অর্জনের পাল্লা ভারী হলেও রাজনীতির গুণগত পরিবর্তন তেমন হয়নি। আগামী জাতীয় নির্বাচনকে কেন্দ্র করে সরকার এবং বিরোধী পক্ষের দূরত্ব ক্রমশ বৃদ্ধি পাচ্ছে। তাই সরকারের মেয়াদের শেষ বছরে দেশবাসীর মনে একটি প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে- আগামী জাতীয় নির্বাচন কীভাবে হবে? একাদশ জাতীয় নির্বাচন অন্তর্বর্তীকালীন, দলীয়, নাকি নির্দলীয় সরকারের অধীনে হবে? সকল দলের অংশগ্রহণে নির্বাচন হবে নাকি বিএনপি-জামায়াত জোট আবার নির্বাচন বয়কট করবে?

এছাড়া সরকারের শেষ বছরে বেশ কয়েকটি স্পর্শকাতর ইস্যু এবং বেশকিছু বড় চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হবে। দ্রব্যমূল্যের লাগাম শক্ত হাতে টেনে ধরতে হবে। জনগণের বহুল আকাঙ্ক্ষিত যুদ্ধাপরাধীদের বিচার সম্পন্ন করতে হবে। রাজনৈতিকভাবে সরকারবিরোধী আন্দোলন মোকাবিলা করে অবাধ, সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন উপহার দিতে হবে।

বিশ্লেষকদের মতে, শেষ বছরে সরকারের সামনে বড় চ্যালেঞ্জ হবে ছাত্রলীগ ও যুবলীগ নামধারী কিছু দুর্বৃত্তের লাগাম টেনে ধরা। সারা দেশে এমপি-মন্ত্রী ও ক্ষমতাসীন দলের নেতাদের আত্মীয়-স্বজন পরিচয় দিয়ে ক্ষমতা অপব্যবহারকারীদের আইনের আওতায় এনে শাস্তি দিতে হবে।

20 Views