এমপি লিটন হত্যাকাণ্ডের এক বছর

35 Views
SHARE

ছাদেকুল ইসলাম রুবেল,গাইবান্ধা ঃ গাইবান্ধা-১ (সুন্দরগঞ্জ) আসনের আওয়ামী লীগের সংসদ সদস্য (এমপি) মঞ্জুরুল ইসলাম লিটন হত্যাকাণ্ডের এক বছর পূর্ণ হয়েছে আজ (রোববার)।
২০১৬ সালের ৩১ ডিসেম্বর সন্ধ্যায় এমপি লিটন নিজ বাড়িতে দুর্বৃত্তদের গুলিতে গুরুতর আহত হয়ে মারা যান। এই চাঞ্চল্যকর হত্যা মামলার মূল অভিযুক্ত একই আসনের জাতীয় পার্টির সাবেক এমপি ডা. আব্দুল কাদের খানসহ সাতজন গ্রেফতার হয়ে কারাগারে আছেন। এক বছরে মামলার রায় না হওয়ায় হতাশা ব্যক্ত করেছেন দলীয় নেতাকর্মীরা।
এদিকে, লিটনের মৃত্যুর পর অনুষ্ঠিত উপনির্বাচনে নির্বাচিত এমপি গোলাম মোস্তফা সড়ক দুর্ঘটনায় আহত হওয়ার পর চিকিৎসাধীন অবস্থায় মৃত্যুবরণ করেন। ফলে পর পর দুই এমপির মৃত্যুতে নেতৃত্ব সঙ্কটে ভুগছে কমিটিবিহীন সুন্দরগঞ্জ উপজেলা আওয়ামী লীগ। তবে এর মাঝেও স্থানীয় আওয়ামী লীগ ও অঙ্গসংগঠন লিটনের মৃত্যু দিবস পালনে বিভিন্ন কর্মসূচি গ্রহণ করেছে।
মামলার বাদী এমপি লিটনের ছোট বোন ফাহমিদা বুলবুল কাকলি বিচারের দীঘসূত্রিতার কথা উল্লেখ করে বলেন, তাড়াহুড়া করে যেন ভুল বিচার না হয় এটাই আমরা চাই। যারা প্রকৃতপক্ষে এই হত্যাকাণ্ডে জড়িত ছিল তারাই যেন উপযুক্ত সাজা পায়।
এদিকে এই হত্যা মামলায় প্রথমদিকে সন্দেহভাজন হিসেবে স্থানীয় জামায়াত শিবির নেতাকর্মীসহ অনেককে গ্রেফতার করা হয়েছিল কিন্তু পরে মূল হত্যাকারী চিহ্নিত হলে তাদের অব্যাহতি দেয়া হয়।
সুন্দরগঞ্জ থানার ওসি এবং মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা আবু হায়দার মো. আশরাফুজ্জামান বলেন, হত্যাকারী চিহ্নিত হলে পূর্বের গ্রেফতারদের মামলা থেকে অব্যাহতি দিয়ে আদালতে চার্জশিট দাখিল করা হয়।
চার্জশিটে ওই আসনের সাবেক এমপি আব্দুল কাদের খান, উপজেলার হলদিয়া গ্রামের ছামসুজ্জোহা, সর্বানন্দ গ্রামের আব্দুল হান্নান, মেহেদী হাসান, আনোয়ারুল ইসলাম রানা, শাহিন মিয়া, মনমথ সরকার পাড়া গ্রামের সুবল ও চন্দনসহ ৮ জনকে অভিযুক্ত করা হয়।
এই ৮ জনের মধ্যে চন্দন পলাতক রয়েছেন। অপর ৭ জনের মধ্যে সুবল ছাড়া বাকি ৬ জন আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেন।
রেড অ্যালাট জারি
গাইবান্ধা সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতের সিএসআই মিজান বলেন, মামলার শুরু থেকে এ পর্যন্ত চন্দন আদালতে উপস্থিত না হওয়ায় তার অনুপস্থিতিতে বিচারের জন্য মামলার নথি আগামী ৭ জানুয়ারি জেলা ও দায়রা জজ আদালতে পাঠানো হবে।
কোর্ট ইন্সপেক্টর জামাল উদ্দিন বলেন, আমরা জানতে পেরেছি- চন্দন পালিয়ে ভারতে ঠাঁই নিয়েছেন। তাকে গ্রেফতার করে দেশে ফিরিয়ে আনতে আন্তর্জাতিক ইন্টারপোলের মাধ্যমে ‘রেড অ্যালার্ট’ জারি করা হয়েছে। শিগগিরই চন্দন গ্রেফতার হবে বলে আশা করেন তিনি।
কাদের খানের বিরুদ্ধে অস্ত্র মামলা
সাংসদ মঞ্জুরুল ইসলাম লিটন হত্যা মামলায় এই আসনের সাবেক সাংসদ আব্দুল কাদের খানকে গত ২২ ফেব্রুয়ারি ১০ দিনের রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদে পুলিশ জানতে পারে লিটন হত্যায় ব্যবহৃত অস্ত্র তার সুন্দরগঞ্জের বাড়ির উঠানে পুঁতে রাখা হয়েছে।
সুন্দরগঞ্জ থানার ওসি আতিয়ার রহমান জানান, এরই পরিপ্রেক্ষিতে ২৩ ফেব্রুয়ারি রাতে সেখান থেকে একটি সচল পিস্তুল ও ৬ রাউন্ড তাজা গুলি ভর্তি পিস্তলের ম্যাগজিন উদ্ধার করা হয়। এ ঘটনায় কাদের খানের বিরুদ্ধে পুলিশ বাদী হয়ে অস্ত্র আইনে একটি মামলা করে। ওই মামলার দীর্ঘ তদন্ত শেষে কাদের খানের বিরুদ্ধে ৯ এপ্রিল গাইবান্ধা অতিরিক্ত চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট ময়নুল হাসান ইউসুফের আদালতে চার্জশিট দেয় পুলিশ।
অতিরিক্ত চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালত থেকে মামলাটি গত ১৫ মে বিচারের জন্য গাইবান্ধা বিশেষ ট্রাইব্যুনাল ১-এ আসে।
১১জনের সাক্ষ্য গ্রহণ
গত ৪ জুন ওই মামলায় কাদের খানের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠনের পর সাক্ষীর জন্য ১৯ জুন দিন ধার্য হয়। রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবি (পিপি) শফিকুল ইসলাম শফি বলেন, এ মামলায় ১৪ নভেম্বর পর্যন্ত ৪৩ জন সাক্ষীর মধ্যে ১১জন সাক্ষ্য দিয়েছেন।
গাইবান্ধা জেলা ও দায়রা জজ রাশেদা সুলতানা তাদের সাক্ষ্য গ্রহণ করেন। এছাড়াও, আগামী ৪ জানুয়ারি আদালতের উপস্থিত হয়ে সাক্ষ্য দেওয়ার জন্য ৬ জনের প্রতি আদালত থেকে সমন জারি করা হয়েছে।
নেতৃত্ব শূন্যতায় সুন্দরগঞ্জ আওয়ামী লীগ
সাংসদ লিটনের মৃত্যুর পর উপনির্বাচনে এমপি নির্বাচিত হন উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক গোলাম মোস্তফা আহমেদ। কিন্তু গত ১৮ নভেম্বর সড়ক দুর্ঘটনায় আহত হয়ে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ১৯ ডিসেম্বর তিনি মৃত্যুবরণ করেন।
গত ২০১৬ সালের ১৮ ফেব্রুয়ারি উপজেলা আওয়ামী লীগের সম্মেলন কমিটি গঠন নিয়ে সৃষ্ট জটিলতায় কাউন্সিল ভন্ডুল হয়ে যায়। যেকারণে তখন থেকে উপজেলা আওয়ামী লীগের কোনো কমিটি নেই। কিন্তু সভাপতি হিসেবে মঞ্জুরুল ইসলাম লিটন ও সাধারণ সম্পাদক হিসাবে গোলাম মোস্তফা আহমেদ নেতৃত্ব দিয়ে আসছিলেন। বর্তমানে এই দুজন প্রয়াত হবার কারণে দলে শূন্যতা দেখা দিয়েছে। দলের সাবেক সভাপতি টি আই এম মকবুল হোসেন প্রামাণিক বলেন, কমিটি না থাকার কারণে দলের একটি সমস্যা তো রয়েছেই। তবে চেষ্টা করছি কর্মীদের নিয়ে দলকে সংগঠিত করতে। দলের নেতাকর্মীদের সাথে আলাপকালে তারা জানান, জামায়াত শিবিরের ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত সুন্দরগঞ্জে এমপি লিটন আওয়ামী লীগকে শক্ত অবস্থানে নিতে পেরেছিলেন। তার মৃত্যুর পর দলের হাল ধরবার মতো যোগ্য কোনো নেতা এগিয়ে আসেননি। প্রবীণ নেতা গোলাম মোস্তফা আহমেদের মৃত্যুর পর এই সংকট আরও ঘনীভূত হয়েছে। দলের কাজ না করে শুধু ব্যক্তিগত লাভের জন্য এমপি মনোনয়ন পেতে অনেক আগ্রহীকেই দেখা যাচ্ছে।
লিটনের মৃত্যুবার্ষিকীতে কর্মসূচি
মঞ্জুরুল ইসলাম লিটনের মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে রোববার উপজেলা আওয়ামী লীগ ও অঙ্গসংগঠন বিভিন্ন কর্মসূচি গ্রহণ করেছে। কর্মসূচির মধ্যে রয়েছে, রোববার সকালে উপজেলা দলীয় কার্যালয়ে পবিত্র কোরআন খানি, শোক পতাকা, জাতীয় ও দলীয় পতাকা উত্তোলন, নেতাকর্মীদের কালোব্যাচ ধারণ, সকাল ৮টায় এমপি লিটনের কবরে পুষ্পস্তবক অর্পণ, সকাল ১০টায় মঞ্জুরুল ইসলাম লিটনের নিজ বাড়িতে স্মরণসভা ও মিলাদ অনুষ্ঠিত হবে।