SHARE

স্বাধীনতাযুদ্ধের সময় পাকিস্তানী সেনাদের গুলিতে স্বামী হারানো ডালিম বেগমের জীবন চলছে ভিক্ষা করে। দেশ স্বাধীনের পর অনেকের ভাগ্য পরিবর্তন হলেও এতটুকু পরিবর্তন হয়নি ডালিম বেগমের। দুই পুত্র সন্তান থাকলেও তার মুখে জোটেনি দুমুঠো ভাত। আর তাই দেশ স্বাধীনের পরও প্রায় ২০বছর ধরে ভিক্ষা করেই জীবন চলছে তার। অপর দিকে নিজের কোন জায়গা জমি না থাকায় মাথা গোঁজার ঠাঁই মেলেছে অন্যের বাড়ীতে। যেখানে ঠিকমত তারই খাবার জোটেনা সেখানে আবার রয়েছে স্বামী হারা তার অসুস্থ মেয়ে। তার মুখেও দুমুঠো ভাত দিতে সউত্তর ঊর্দ্ধো বয়সেও এখনো যেতে হচ্ছে মানুষের দাঁড়ে দাঁড়ে। সম্প্রতি এ প্রতিবেদকের কাছে সেই গল্পই শোনালেন ডালিম বেগম।

ডালিম বেগম জানান, তার স্বামী রস্তম ব্যাপারীর বাড়ী ছিল পাবনাতে। তিনি ছিলেন কাঠ মিস্ত্রি। স্বাধীনতার যুদ্ধ চলাকালে নদীর পাড়ে নৌকা বানানোর সময় পাকিস্তানী সেনাদের গুলিতে মারা যান তিনি। স্বামী রস্তম ব্যাপারী যখন পাকিস্তানী সেনাদের গুলিতে মারা যান তখন তিনি ছিলেন দুই পুত্র ও এক কন্যা সন্তানের জননী। কিন্তু বয়সে ছিলেন সবে মাত্র ত্রিশ। কিন্তু ছোট ছোট ছেলে মেয়েদের মুখের দিকে তাকিয়ে দ্বিতীয় বিয়ে করেননি তিনি। দেশ স্বাধীনের পর চলে আসেন রাজবাড়ীতে। শুরু করেন অন্যের বাড়ীতে গৃস্থেথালীর কাজ। এক সময় ছেলে মেয়েরাও বড় হয়। তারও বয়স বাড়ে। দুই ছেলে ও মেয়েকে বিয়েও দেন। কিন্তু ছেলেদের ঘরে ঠাঁই হয়নি তার। দুই ছেলেই যখন তার ভরন পোষন করতে অনীহা প্রকাশ করেন তখন বয়সের ভাড়ে কাজ করার ক্ষমতা হারিয়ে ফেলায় নামেন ভিক্ষাবৃত্তিতে। নিজের কোন জায়গা জমি না থাকায় আশ্রয় মেলে অন্যের বাড়ীতে। শুরু হয় অন্য জীবন। দুই ছেলে জীবিত থাকলেও তার কাছে হয়ে যায় যেন মৃত। এর রেশ কাটতে না কাটতেই মরার উপর খাড়ার ঘা হয়ে দাঁড়ায় বিবাহিত মেয়ে কমেলা খাতুন। স্বামী জনাব আলী ৪/৫টি বিয়ে করায় সেখান থেকে চলে আসেন মেয়ে কমেলা খাতুন। এর কিছুদিন পর কমেলার স্বামীও মারা যান। সে কারণে স্বামীর বাড়ীতে আর ফেরারও হয়নি তার। এও প্রায় ২০বছর আগের ঘটনা। দুই ছেলে তাকে ফেলে দিয়েছিলেন কিন্তু তিনি মেয়ে কমেলাকে ফেলতে পারেননি। সারাদিন ভিক্ষা করে যা পান তাই দিয়েই দুই মা-মেয়ে কখনো খেয়ে কখনো না খেয়ে দিন পাড় করতে থাকেন। এর মধ্যে নানা রোগ বাসা বাঁধে তাদের দুজনেরই শরীরে। টিউমারসহ কয়েক বার অপারেশন হতে হয় দুজনকেই।

ডালিম বেগম জানান, বেশ কয়েক বছর ধরেই তিনি রাজবাড়ী জেলা সদরের মিজানপুর ইউনিয়নের চরনারায়নপুর কাকিলাদাইর এলাকায় এক বাড়ীতে থাকেন। কিন্তু তিনি বাড়ীর মালিকের নাম ভাল মতো বলতে পারেননি। তার মেয়ে কমেলা খাতুনের বয়সও প্রায় ৫৫/৫৬ বছর। ওর মাথায় একটু সমস্যা থাকায় সবাই তাকে পাগল বলে ডাকে। ও কাজকর্মও করতে পারে না। আমাকেই ভিক্ষা করে ওকে খাওয়াতে হয়। মিজানপুর ইউনিয়নের চেয়ারম্যান আমাকে একটি বয়স্ক ভাতার কার্ড করে দিয়েছেন। এছাড়া অন্য কিছু আর পান না। বয়স্ক ভাতা দিয়ে দুই মা মেয়ের চলে না তাই এখনো তিনি ভিক্ষা করেন।

তিনি আরো বলেন, আমার পাগল মেয়ের জন্য চেয়ারম্যান মেম্বারদের অনেকে ধরেছি। সরকার কত কার্ডই তো মানুষকে দিচ্ছে। কিন্তু কেউ আমার মেয়ের একটা কার্ড দেয় না। কতজন কত কিছু পায় আমরা কিছুই পাই না। শুধু শুনিই এখানে এটা দিচ্ছে, ওখানে ওটা দিচ্ছে। কিন্তু আমরা পাই না।

তিনি দুঃখ প্রকাশ করেন বলেন, আমি এখন আর আগের মতো হাঁটতে পারিনা। পাগল মেয়েটাকে একলা ছাড়তেও পারিনা। কোথা থেকে কোথায় চলে যাবে এ ভয়ে একা তাকে ছাড়িওনা। কিন্তু এদিকে দুজনের সংসারও তো চলে না। আমাদের একটা ব্যবস্থা করেন না। শুনি সরকার গরীব মানুষের কত কিছু দেয়।

প্রিয় পাঠক, প্রধানমন্ত্রীর প্রতিশ্রুতিবদ্ধ “যার জমি আছে ঘর নেই, তার নিজ জমিতে গৃহনির্মাণ” এ প্রকল্পের অধীনে সারাদেশে গরীব মানুষ ঘর পেয়েছে। রাজবাড়ীতে এ প্রকল্পের অধীনে প্রতিটি ইউনিয়নে ৫টি করে ঘর দেয়া হয়েছে। আবার যার জমিও নেই, ঘরও নেই তার জন্যও আছে আশ্রয়ন প্রকল্প। এসব প্রকল্প থাকার পরও ডালিমদের ভাগ্যে জোটেনি কিছুই। প্রিয় পাঠক, সরকার খোঁজ নিক আর না নিক ডালিমদের পাশে দাঁড়াতে পারেন আপনিও। আপনার একটু সহানুভুতি ও সহযোগিতায় বাকী কয়টা দিন ভালভাবে বেঁচে থাকতে পারবে ডালিম বেগম ও তার মেয়ে কমেলা খাতুন।

42 Views