জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের কি অভিভাবক নেই?

জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের ২১ লাখ শিক্ষার্থী কেমন আছেন, কতটা শিক্ষা পাচ্ছেন? পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মোট শিক্ষার্থীর কয়েক গুণ শিক্ষার্থী লেখাপড়া করেন জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে। বিশ্ববিদ্যালয়টি ২১ লাখ শিক্ষার্থীকে পড়ানোর দায়িত্ব পালনে অনেকটাই ব্যর্থ। বর্তমান উপাচার্য দায়িত্ব নেওয়ার আগে প্রায় তিন বছর সেশনজট ছিল। তিনি সেশনজট দূর করার উদ্যোগ নিয়েছেন। ফল হয়েছে এই, তাঁদের শিক্ষাজীবন পরিণত হয়েছে পরীক্ষাজীবনে। ক্লাস হয় মাঝে মাঝে, পরীক্ষা হয় নিয়মিত। এতে করে কিছুটা সেশনজট কমছে। কিন্তু পড়ালেখার চরম অবনতি সাধিত হয়েছে। এখান থেকে যেসব শিক্ষার্থী পাস করবেন, তাঁদের নিজ চেষ্টায় অথবা কোচিং থেকে পাঠ নিতে হবে। শিক্ষার্থীদের সঙ্গে এটা সুস্পষ্ট প্রতারণা।

শিক্ষার্থীরা মোট কত ঘণ্টা পাঠগ্রহণের সুযোগ পেয়েছেন, এ প্রশ্ন উঠলে তাঁদের সার্টিফিকেট প্রশ্নবিদ্ধ হতে পারে। না পড়িয়ে শুধু পরীক্ষা গ্রহণ করে সার্টিফিকেট দেওয়ার ধারণা আমাদের দেশে নতুন নয়। এর আগে কিছু কিছু প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয় সম্পর্কে না পড়িয়ে সার্টিফিকেট-বাণিজ্যের অভিযোগ ছিল। জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার মান বিচার করলে তা অনেকের কাছে কোচিং সেন্টারের চেয়েও খারাপ বলে মনে হবে। সেশনজট কমানোর এ পদ্ধতি অনেকটা হাতুড়ে চিকিৎসকের মতো। কোচিং সেন্টারগুলো টাকার বিনিময়ে পড়ায়, সার্টিফিকেট দেয় না। জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় না পড়িয়ে টাকা নেয় এবং সার্টিফিকেট দেয়।

প্রতিষ্ঠানটি যে অনেক ব্যাধিতে আক্রান্ত। কিন্তু বিভিন্ন সময়ে যেসব চিকিৎসাপত্র দেওয়া হয়, ততে করে অবস্থার আরও অবনতিই হয়। এখন আবার অন্য চিকিৎসাপত্র চালু করেছে। জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় এই ১৫ অক্টোবর ২০১৭-১৮ শিক্ষাবর্ষে প্রথম বর্ষ স্নাতক সম্মান শ্রেণির ক্লাস শুরু করেছে। আপাতদৃষ্টিতে এটি সাধুবাদ পাওয়ার মতো বিষয় মনে হতে পারে। কিন্তু বাস্তবে এটি জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের নির্বুদ্ধিতা অথবা অর্থ উপার্জনের নয়া ফাঁদ। বাংলাদেশে কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ে ক্লাস শুরু হওয়ার আগেই জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় ক্লাস শুরু করাটা অযৌক্তিক। শিক্ষার্থীরা প্রথমে চেষ্টা করেন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার। সেখানে সুযোগে না পেলে তবেই জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় অধিভুক্ত কলেজগুলোতে পড়তে আসেন। সবার আগে ক্লাস শুরু করাটা শুধুই দেখানোপনা, নাকি এর পেছনে বাণিজ্যিক উদ্দেশ্য আছে, তা ভেবে দেখা প্রয়োজন। সরকার তথা দেশবাসীকে দেখানো যে আমরা সবার আগে ক্লাস শুরু করেছি।
প্রথম মেধাক্রম থেকে যাঁরা ভর্তি হয়েছেন, তাঁদের নিয়েই প্রথম বর্ষের ক্লাস শুরু হয়েছে। প্রথম মেধাক্রম থেকে মোট আসনের অর্ধেকও ভর্তি হননি। প্রথম মেধাক্রম থেকে যাঁরা ভর্তি হয়েছেন, তার একটা বড় অংশ বিভিন্ন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে চলে যাবে। ভর্তি বাতিল করলেও তাঁরা ভর্তির টাকা ফেরত পাবেন না। প্রথম মেধাক্রমে ভর্তি হওয়া শিক্ষার্থীরা অনেকেই থাকবেন না জেনেও যখন জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় শুরুতে ক্লাস চালু করছে, তখন সেই প্রশ্নটিই বড় হয়ে দেখা দেয়—জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় কি ভর্তিকৃত শিক্ষার্থীদের বাতিলপ্রক্রিয়া থেকে প্রচুর অর্থ উপার্জন করতে চায়? রংপুরের কারমাইকেল কলেজে যদি আসন থাকে পাঁচ হাজার, তাহলে বাতিলসহ মোট ভর্তিকৃত শিক্ষার্থী হয়তো হবে ১০ হাজার। তাহলে অতিরিক্ত পাঁচ হাজার শিক্ষার্থীর টাকা লাভ (বাণিজ্য!) হলো। এভাবে সারা দেশে থেকে কত টাকা আসতে পারে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় তহবিলে, সে হিসাব কি জানা আছে? আর তা ছাড়া পরে যাঁরা ভর্তি হবেন, তাঁদের জন্য কি শিক্ষকেরা নতুন করে ক্লাস নেবেন? জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের কি কোনো অভিভাবক নেই?

এ প্রতিষ্ঠান সারা দেশে উপজেলা পর্যায়ে, এমনকি ইউনিয়ন পর্যায়ে পর্যন্ত অনেকগুলো কলেজে অনার্স খুলেছে। সরকার বেতন দেয় না ওই সব বেসরকারি কলেজের শিক্ষকদের। ফলে শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে উচ্চহারে মাসিক বেতন নির্ধারণ করা হয়েছে। অনার্স পড়ানো হয়—এ রকম সরকারি কলেজগুলোকে বিভিন্ন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে দেওয়ার প্রক্রিয়া চলছে। বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনকে এ ক্ষেত্রে বড় ভূমিকা পালন করতে হবে। যেসব কলেজকে যে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে দেওয়া হবে, সেগুলোয় আলাদা জনবল নিয়োগ করতে হবে। কলেজগুলোয় লেখাপড়ার প্রকৃত পরিবেশ সৃষ্টির জন্য প্রয়োজনীয়সংখ্যক শিক্ষকের ব্যবস্থাও করতে হবে।

জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় থেকে যেহেতু প্রচুরসংখ্যক শিক্ষার্থী পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে চলে যান, তাই কেউ ভর্তি বাতিল করে অন্যত্র চলে গেলে তাঁদের টাকা ফেরত দেওয়ার একটি নিয়ম করা উচিত। জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ে মোট যতটি আসন আছে, তার চেয়ে বেশিজন ভর্তি-ইচ্ছুকের ফি গ্রহণ করাটা অনৈতিক। বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন চাইলে সব বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য অভিন্ন এ নিয়ম করার জন্য অনুরোধ কিংবা নির্দেশনা দিতে পারে। যে শিক্ষার্থীরা উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করতে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হন, তাঁরা আসলে পড়তেই যান। সেখানেও অনেক মেধাবী শিক্ষার্থী আছেন। তাঁদের মেধার পরিচর্যা করার জন্য জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের আরও যত্নশীল হওয়া অত্যন্ত জরুরি। আমরা চাই ২১ লাখ শিক্ষার্থীর সুস্থ বিকাশ। জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় যদি ভালো চলে, তাহলে এই শিক্ষার্থীরা হতে পারে অনন্য সম্পদ।

তুহিন ওয়াদুদ: শিক্ষক, বাংলা বিভাগ, বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়, রংপুর
wadudtuhin@gmail.com