জাতীয়

হাটের ১০ লাখ গরু বিক্রি হয়নি

রাজধানীর অন্যতম প্রধান গরুর হাট গাবতলীতে সর্বোচ্চ ৬০ হাজার গরু-মহিষ বিক্রির জন্য রাখা সম্ভব। এবার ঈদের শেষ দিন সেখানে গরু উঠেছিল প্রায় দেড় লাখ। হাটের মধ্যে জায়গা না হওয়ায় আশপাশের এলাকা-সড়ক সবখানে গরু বিক্রির জন্য রাখা হয়। কিন্তু গরু বিক্রি হয়েছে প্রায় ৭০ হাজার। প্রায় ৮০ হাজার গরু বিক্রি করতে না পেরে ব্যবসায়ীরা ফেরত নিয়ে গেছেন।

শুধু গাবতলী নয়, রাজধানীর বেশির ভাগ গরুর হাটে ১৫ থেকে ২০ শতাংশ গরু এবার বিক্রি হয়নি। হাটের শেষ দিন, অর্থাৎ ঈদের আগের দিন রাতে গরুর দাম পড়ে যায়। ২০ থেকে ৩০ শতাংশ কম দামেও ব্যবসায়ীরা ক্রেতা পাননি। ঈদের দিন বিকেল পর্যন্ত অনেক হাটে গরু বিক্রি হতে দেখা গেছে।

প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের হিসাবে কোরবানির জন্য প্রস্তুত হওয়া ৫০ লাখ গরু ছিল এবার। এর মধ্যে প্রায় ১০ লাখ গরু বিক্রি হয়নি বলে রাজধানীর বিভিন্ন গরুর হাট পরিচালনা কমিটি ও গরুর খামারিদের সংগঠন বাংলাদেশ ডেইরি ফারমারস অ্যাসোসিয়েশনের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে।

এ ব্যাপারে রাজধানীর গাবতলী গরুর হাটের পরিচালনা কমিটির সদস্য সানোয়ার হোসেন বলেন, ‘গাবতলী হাটের ইতিহাসে এত গরু কখনো ওঠেনি। অর্ধেকের বেশি গরু আমরা হাটে জায়গা দিতে পারিনি। আর ৭০ থেকে ৮০ হাজার গরু ফেরত গেছে।’

তবে হাট কর্তৃপক্ষ ও খামারিরা বলছেন, বিক্রি না হওয়া গরুর বেশির ভাগই বড় আকৃতির। ছোট ও মাঝারি গরুর বড় অংশ ঈদের আগের দিন বিক্রি হয়ে গেছে। বেশি লাভের আশায় যাঁরা খামারে দীর্ঘদিন ধরে গরু লালন-পালন করে বড় করেছেন, তাঁদের খরচের পুরোটাই লোকসান হয়েছে।

খামারিরা লাভবান, ব্যবসায়ীরা লোকসানে

তবে অনলাইন বা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও সরাসরি খামার থেকে যাঁরা গরু বিক্রি করেছেন, তাঁরা এ ধরনের বিপদে পড়েননি। তাঁদের বেশির ভাগ গরু বিক্রি হয়ে গেছে। ঈদের তিন-চার দিন আগে গরুর দাম বেড়ে গেলে খামারিদের কাছে থাকা গরু ক্রেতা ও ব্যবসায়ীরা কিনে নেন। ফলে সবচেয়ে বেশি লোকসানে পড়েছেন ফড়িয়া ও ব্যবসায়ীরা।

তবে প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয় ও বাংলাদেশ ডেইরি ফারমারস অ্যাসোসিয়েশন মনে করছে, এবার শেষ সময়ে গরুর জোগান বেড়ে যাওয়া, দাম কমে যাওয়া এবং বিপুল সংখ্যায় গরু অবিক্রীত থাকার মধ্য দিয়ে প্রমাণিত হলো ভারতীয় ও মিয়ানমারের গরু ছাড়াই কোরবানির চাহিদা মেটানো গেছে। উল্টো এবার গরু চাহিদার চেয়ে বেশি ছিল। অর্থাৎ বাংলাদেশ এখন গরুতে স্বয়ংসম্পূর্ণ।

এ ব্যাপারে প্রাণিসম্পদমন্ত্রী নারায়ণ চন্দ্র চন্দ প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমরা প্রতিবছর কোরবানির সময় গরুর ঘাটতি নিয়ে চিন্তিত থাকি। এবার উদ্বৃত্ত গরু নিয়ে আমরা বিচলিত ছিলাম। শুধু কোরবানি ঈদ মাথায় রেখে গরু লালন–পালন না করে কৃষক ও খামারিরা যাতে সারা বছর গরু বিক্রির বিষয়টি বিবেচনায় রাখেন, সে ব্যাপারে তাঁদের সহযোগিতা দেওয়ার পরিকল্পনা করছি। দেশি গরু দিয়ে আমরা চাহিদা মেটাতে পারি।’

বড় শহরে শেষ দিনে দাম পড়ে যায়

কোরবানির ঈদের চার-পাঁচ দিন আগে রাজধানীসহ দেশের বিভাগীয় শহরের হাটগুলোতে গরুর দাম বেড়ে যায়। ছোট আকারের গরু গত বছর ৪০ থেকে ৬০ হাজার টাকায় বিক্রি হলেও এবার দাম ৭০ থেকে ৮০ হাজার টাকা পর্যন্ত ওঠে। মাঝারি গরুর দাম এক লাখ টাকার নিচে পাওয়া যায়নি। বড় শহরে বেশি দামে গরু বিক্রির খবর পেয়ে অধিক লাভের আশায় দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে ব্যবসায়ীরা গরু কিনে ওই হাটগুলোর দিকে রওনা হন। সড়কপথে যানজট ও পরিবহন ভাড়া বেশি দিয়ে তাঁরা শেষ সময়ে রাজধানীর হাটগুলোতে হাজির হন। কিন্তু একই সময়ে অনেক গরু হাটে চলে আসায় হঠাৎ করে দাম পড়ে যায়।

তবে গরু ব্যবসায়ী ও হাট পরিচালনা কমিটিগুলো বলছে, এবার রাজধানীতে অন্য যেকোনো বছরের তুলনায় গরু বিক্রি ছিল কম। যেসব ক্রেতা একাধিক গরু কেনেন, তাঁরা এবার একটি গরু ও একটি ছাগল কিনে ফিরে গেছেন। ফলে বাজারে বড় গরু বিক্রি কম হয়েছে। আর রাজধানীর ক্রেতাদের বড় অংশ ঢাকার আশপাশের খামারগুলো থেকে চার থেকে আট দিন আগে গরু কিনে রেখে দিয়েছিল।

এ ব্যাপারে গবাদিপশু লালন-পালনে সহায়তা প্রদানকারী সংস্থা সজাগের নির্বাহী পরিচালক আবদুল মতিনের সঙ্গে কথা হয়। তিনি জানান, তাঁদের কাছ থেকে ঋণ ও কারিগরি সহায়তা নিয়ে সাভার ও ধামরাই এলাকায় ২২ হাজার গরু লালন-পালন করা হয়েছে। এগুলোর প্রায় সব কটি খামার থেকে বিক্রি হয়ে গেছে। স্থানীয় অনেক গরু ব্যবসায়ী বেশি লাভের আশায় রাজধানীর হাটে গরু নিয়ে গিয়েছিলেন। তাঁদের অর্ধেক গরু বিক্রি করতে না পেরে ফেরত নিয়ে এসেছেন।

সাঁথিয়া ও বেড়া উপজেলায় প্রায় ৩০ হাজার গরু কিনে ব্যবসায়ীরা কোরবানির জন্য রাজধানীর বিভিন্ন হাটে নিয়ে গিয়েছিলেন। এর বেশির ভাগ গরু বিক্রি হয়নি। এ ছাড়া কুষ্টিয়া, চুয়াডাঙ্গা, মেহেরপুরসহ বেশির ভাগ এলাকার ব্যবসায়ীরা গরু নিয়ে একই ধরনের বিপদে পড়েছিলেন।

বাংলাদেশ ডেইরি ফারমারস অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক শাহ কামাল বলেন, যাঁরা পরিকল্পিতভাবে ও সঠিকভাবে বাজার পর্যবেক্ষণ করে গরু বিক্রি করেছেন, তাঁদের কারও লোকসান হয়নি। বিশেষ করে সরাসরি খামার ও অনলাইনের মাধ্যমে বিক্রির জন্য তোলা খুব কম গরুই অবিক্রীত থেকেছে।

এই পরিস্থিতিতে শাহ কামাল বলেন, সরকার খামারে খাবারের দাম কমানোর ব্যাপারে উদ্যোগ নিলে সারা বছর প্রতি কেজি গরুর মাংসের দাম ৪০০ টাকার নিচে নামিয়ে আনা যাবে। তখন শুধু কোরবানিকে উপলক্ষ না করে খামারিরা সারা বছর গরু বিক্রির পরিকল্পনা করবে।