খুলনা বিভাগ

মণিরামপুরে ক্লিনিকে প্রসূতির মৃত্যু, ভূয়া চিকিৎসক আটক

মোঃ মনোয়ার হোসেন, যশোর জেলা প্রতিনিধি: যশোরের মণিরামপুরে মনোয়ারা ক্লিনিকে সন্তান প্রসব করতে এসে ভুল চিকিৎসায় এক প্রসূতির মৃত্যু হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। এই ঘটনায় নিহত প্রসূতি সামছুন্নাহারের স্বামী আসাদুজ্জামান বাদি হয়ে ১০ জনের নাম উল্লেখ করে থানায় একটি হত্যা মামলা দায়ের করেছেন। মামলার সূত্রধরে শনিবার রাতে পুলিশ ক্লিনিকে অভিযান চালিয়ে ক্লিনিকের মালিক কথিত সার্জিক্যাল চিকিৎসক আব্দুল হাইকে আটক করেছেন।
আটক কথিত চিকিৎসক আব্দুল হাই উপজেলার জামজামি গ্রামের মৃত আফসার আলী বিশ^াসের ছেলে। তিনি নিজে চিকিৎসক না হলেও সার্জিক্যাল চিকিৎসক সেজে বহুদিন ধরে রোগী ও রোগীর স্বজনদের ধোকা দিয়ে আসছেন বলে অভিযোগ উঠেছে।।
মামলার অন্য আসামিরা হলেন, অভয়নগর উপজেলার নওয়াপাড়া এলাকার সুব্রত মহলদার, মণিরামপুর উপজেলার কাজির গ্রামের শরিফুল ইসলাম, সুবলকাঠি গ্রামের সাইফুল ইসলাম, জয়পুর গ্রামের মোন্তাজ হোসেন, স্বরুপদহ গ্রামের তানিয়া সুলতানা হালিমা, হাসাডাঙ্গার নাসিমা খাতুন, সদর উপজেলার সিরাজসিংহ গ্রামের দীপা খাতুন, রামনগর গ্রামের মঞ্জুয়ারা খাতুন এবং ভূয়া চিকিৎসক আব্দুল হাইয়ের স্ত্রী মনোয়ারা খাতুন।
এদিকে চিকিৎসক গ্রেফতার হওয়ার খবরে ক্লিনিকে ভর্তি হওয়া রোগীদের অন্যত্র সরিয়ে নিয়েছেন স্বজনরা। গ্রেফতার আতঙ্কে অন্য আসামিরা ক্লিনিক ছেড়ে পালিয়েছেন।
থানায় দায়ের করা মামলার এজাহারে উল্লেখ করা হয়, বৃহস্পতিবার (১২ এপ্রিল) রাতে উপজেলার জয়পুর গ্রামের আসাদুজ্জামানের স্ত্রী সামছুন্নাহার এর প্রসব বেদনা ওঠে। তখন সে তার স্ত্রীকে পৌর শহরের মণিরামপুর সরকারি বালক উচ্চ বিদ্যালয় গেটে অবস্থিত মনোয়ারা ক্লিনিকে ভর্তি করান। বাইরে থেকে ডাক্তার আনার কথা বলে সাড়ে ১১ হাজার টাকা চুক্তিতে সিজারের কথা বলে ক্লিনিকের মালিক আব্দুল হাই রোগীকে ভর্তি করান। কিন্তু রাত গড়ালেও কোন ডাক্তার আসেননি। অবশেষে ওই দিন রাত সাড়ে ১১টার দিকে ক্লিনিকের মালিক আব্দুল হাই নিজেই সার্জিক্যাল চিকিৎসক সেজে অপারেশন থিয়েটারে ঢুকে সামসুন্নাহারের অপারেশন করান। সিজারিয়ানের মাধ্যমে সামছুন্নাহার একটি পুত্র সন্তান প্রসব করেন। আব্দুল হাইয়ের সহযোগীরা সেই নবজাতককে এনে পিতা আসাদুজ্জামানের কোলে দেন। আসাদুজ্জামান তার স্ত্রীর কথা জানতে চাইলে রোগী ভাল আছেন বলে জানান কথিত চিকিৎসক আব্দুল হাই। কিছুক্ষণপর চিকিৎসক আব্দুল হাই জানান, রোগীর অবস্থা খারাপ তাকে খুলনায় নিতে হবে। ঘন্টা দেড়েক পরে আবার চিকিৎসক জানান খুলনায় নয়, রোগীকে এই মুহুর্তে যশোর সদর হাসপাতালে ভর্তি করাতে হবে। পরে চিকিৎসকের কথামত রাত সাড়ে তিনটার দিকে প্রসূতির স্বামী আসাদুজ্জামান ক্লিনিকের অ্যাম্বুলেন্সে করে স্ত্রীকে নিয়ে যশোরের উদ্দেশ্যে রওনা হন। ওই সময় অ্যাম্বুলেন্সে ক্লিনিকের মালিক আব্দুল হাই নিজেও ছিলেন।
আসাদুজ্জামানের অভিযোগ, অ্যাম্বুলেন্সে উঠানোর সময় ভেতরে আলো বন্ধ করা ছিল। তিনি আলো জ্বালাতে বললে রোগীর ক্ষতি হবে বলে জানান চিকিৎসক। অ্যাম্বুলেন্স কিছুদূর গেলে আব্দুল হাই আসাদুজ্জামানের দুই পা জড়িয়ে ধরেন। মালিক তাকে প্রলোভন দেখিয়ে বলেন, যদি রোগী মারা যান তাহলে তিনি (আসাদুজ্জামান) যেন কাউকে কিছু না জানান। তিনি নবজাতকের যাবতীয় দায়িত্ব নেবেন এবং আসাদুজ্জামানকে তার ক্লিনিকে চাকরি দেবেন। পরে অ্যাম্বুলেন্সটি উপজেলার কুয়াদা বাজার পার হলে ভেতরে আলো জ্বালিয়ে সামছুন্নাহারকে মৃত ঘোষণা করেন আব্দুল হাই।
এদিকে মণিরামপুর পৌর শহরের জনৈক বোরহান উদ্দিন জাকির বলেন, দুই-তিন বছর আগে আব্দুল হাই আমার ঘর ভাড়া নিয়ে প্রথমে মনোয়ারা ক্লিনিক খোলেন। তখন উপজেলার হাকোবা গ্রামের এক রোগীর মৃত্যু হলে স্বজনরা আমার ঘর (ক্লিনিক) ভাঙতে আসেন। পরে খবর নিয়ে জানতে পারি বিভিন্ন সময়ে মনোয়ারা ক্লিনিকে রোগী মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে। তাই আমার ঘর থেকে ক্লিনিক উঠিয়ে দেওয়া হয়। আমার ঘর ছেড়ে পরে মণিরামপুর সরকারি বালক উচ্চ বিদ্যালয় গেটে ঘর ভাড়া নিয়ে পুনরায় ক্লিনিক চালু করেন আব্দুল হাই।
খবর নিয়ে আরও জানা যায়, গত বছর ওই ক্লিনিকে উপজেলার কামালপুর গ্রামের সোনিয়া খাতুন নামের এক প্রসূতির মৃত্যু হয়। তখন মালিক আব্দুল হাই নবজাতকের দায়িত্ব নেবেন বলে রোগীর স্বজনদের হাত-পা জড়িয়ে ধরে রক্ষা পান। কিন্তু পরে আর তিনি সেই নবজাতকের খবর নেননি বলে অভিযোগ রয়েছে।
মণিরামপুর থানার ওসি সহিদুল ইসলাম বলেন, এ ঘটনায় নিহত প্রসূতি শামসুন্নাহারের স্বামী আসাদুজ্জামান ক্লিনিকের মালিক আব্দুল হাইসহ ১০ জনের নাম উল্লেখ পূর্বক আরও ৪/৫জনকে অজ্ঞাতনামা থানায় একটি হত্যা মামলা করেছে, (যার নং ১৬, তারিখ ১৪-০৪-২০১৯)। এ মামলায় অভিযুক্ত মনোয়ারা ক্লিনিকের মালিক ভূয়া চিকিৎসক আব্দুল হাইকে আটক করা হয়েছে এবং ক্লিনিকটি বন্ধের জন্য সিভিল সার্জন বরাবর আবেদনের প্রক্রিয়া চলছে। এছাড়া মামলায় অভিযুক্ত অন্য আসামীদের আটকের চেষ্টা অব্যাহত রয়েছে।
মণিরামপুর উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. শুভ্রা রানী দেবনাথ বলেন, সম্প্রতি মনোয়ারা ক্লিনিকের বিরুদ্ধে ভূয়া চিকিৎসক দিয়ে অপারেশন করানোর বিষয়ে ইউএনওর দপ্তরে একটি অভিযোগ পড়েছে। তাছাড়া ওই ক্লিনিকে রোগীর মৃত্যু নিয়ে শনিবার হাসপাতালের পক্ষ থেকে একটি তদন্ত হয়। তদন্তে জানা যায় ওই ক্লিনিকের মালিক আব্দুল হাই নিজে চিকিৎসক না হয়েও রোগীর অপারেশন করান এবং ওই ক্লিনিকের চিকিৎসক সুব্রত কুমার মহলদার ইউনানী চিকিৎসক হয়েও নিজেকে এমবিবিএস সাজিয়ে ক্লিনিকে অপারেশনের কাজ চালান।
যশোর জেলা সিভিল সার্জন ডা. দিলীপ কুমার রায় বলেন, ঘটনাটি জেনেছি, এটি খুবই দু:খ জনক। ওই ক্লিনিকের বিরুদ্ধে কালই ব্যবস্থা নেওয়া হবে।