ঢাকা বিভাগ

দৌলতপুরে চার জয়িতার সাফল্য অর্জন

মানিকগঞ্জ থেকে এ.বি.খান বাবু ঃ মানিকগঞ্জের দৌলতপুর উপজেলায় শিক্ষা-চাকুরী, সফল জননী,দারিদ্রতা ও নারী নির্যাতন মূলক সাফল্য অর্জনের ক্ষেত্রে চার জন জয়িতা নারী নির্বাচিত হয়েছেন। এরা হলেন- শিক্ষা ও চাকুরীর ক্ষেত্রে সাফল্য অর্জনকারী নারী শিল্পী রানী সূত্রধর, সফল জননী নারী রুবি আক্তার দারিদ্রতাকে মুছে ফেলা অর্থনৈতিকভাবে স্বচ্ছলতায় ছখিনা বেগম ও নির্যাতনে বিভীষিকা মুছে ফেলা নতুন উদ্যমে মাহবুবা ইসলাম।

দৌলতপুর উপজেলার কলিয়া ইউনিয়নের গাজীছাইল গ্রামের নিমাই চন্দ্র সূত্রধরের মেয়ে শিল্পী রানী সূত্রধর জানান-আমার জন্ম অতিদরিদ্র একটি পরিবারে। যে সংসারে শুধু দারিদ্রতার প্রভাবই নয়, অশিক্ষার প্রাচীর দ্বারা ঘেরা পরিবারটি। টাকার অভাবে স্কুল-কলেজ কি জিনিস আমি বুঝতে পারিনি। আমার পিতার নিজস্ব কোন জমি ছিল না, অন্যের বসত ভিটায় ঘর তুলে থাকি। পাড়ার ছেলে-মেয়েরা যখন বই নিয়ে স্কুলে যায় তখন আমারও ওদের মত স্কুলে যেতে ইচ্ছে করত। মা-বাবাকে বলেছিলাম আমি স্কুলে যাব, বাবা বলেছিল স্কুল তোদের জন্য নয়, ধনী লোকদের সন্তানদের জন্য হচ্ছে লেখা-পড়া। এই কথা শোনার পর আমি কষ্টে ভেঙ্গে পড়েছিলাম। একদিন এক ব্র্যাকের সামাজিক উন্নয়ন কর্মী আমাদের বাড়ীতে এসে বলেন, প্রাথমিক বিদ্যালয়ে বিনা পয়সায় স্কুলে ভর্তি এবং বই দেওয়া হয়। সেই থেকে আমি স্কুলে ভর্তি হই। পাশের বাড়ির মেয়েদের দেওয়া পুরাতন জামা-কাপড় পড়ে স্কুলে যাওয়া শুরু করি। প্রথম শ্রেণী থেকে পঞ্চম শ্রেণী পর্যন্ত আমি দ্বিতীয় স্থান লাভ করি। আমি লেখা-পড়ার পাশাপাশি বাড়িতে হাঁস, মুরগি ও ছাগল পালন শুরু করি। অষ্টম শ্রেণী পাশ করার পর হালকা টিউশনী করি। এভাবেই এস.এস.সি’তে ৩.৬৩ ও এইচ.এস.সি’তে ৪.২৮ পাই। পরে মানিকগঞ্জ সরকারি দেবেন্দ্র কলেজে বি.বি.এস ব্যবস্থাপনা বিভাগ থেকে ২য় বিভাগে পাশ করি এবং এম.বি.এস ব্যবস্থাপনা বিভাগ হইতে দ্বিতীয় বিভাগে পাশ করি। আমি বর্তমানে মানিকগঞ্জ হোলি চাইল্ড স্কুলে শিক্ষকতার পাশা পাশি টিউশনী করে আমার দরিদ্র বাবাকে সংসার চালাতে সাহায্য করি এবং ছোট ভাইয়ের লেখা-পড়ার খরচ চালাই। আমি পাশা পাশি গ্রামের বাল্যবিবাহ প্রতিরোধে সচেতনতায় কাজ করি। শিক্ষা ও চাকুরীর ক্ষেত্রে সাফল্য অর্জনকারী জয়িতা নারী শিল্পী রানী সূত্রধর সকলের দোয়া চেয়েছেন।

উপজেলার চকমিরপুর ইউনিয়নের দৌলতপুর গ্রামের মোঃ লুৎফর রহমানের মেয়ে রুবি আক্তার জানান- আমার জন্ম অন্ধকারে ঘেরা এক অতি দরিদ্র মুসলিম পরিবারে। দারিদ্রতা ও অর্থ অভাবের কারণে স্কুলে পাঠায়নি পরিবার। একদিন প্রাথমিক বিদ্যালয়ের একজন শিক্ষিকা আমাদের বাড়ীতে এসে মা-বাবাকে বুঝায় এবং বলেন স্কুলে বিনা বেতনে ভর্তি ও বই দেওয়া হয়। পরে আমাকে স্কুলে ভর্তি করে দেয়। আমি প্রথম শ্রেণী থেকে পঞ্চম শ্রেণী পর্যন্ত দ্বিতীয় স্থান লাভ করি। পঞ্চম শ্রেণী পাশ করার পর দৌলতপুর পাইলট বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ে ভর্তি হই। অষ্টম শ্রেণী পাশ করার পর থেকে বাড়িতে হাঁস-মুরগি পালন করি এবং প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ছাত্র-ছাত্রীদের প্রাইভেট পড়াই। এস.এস.সি পাশ শেষে যুব উন্নয়ন অফিস থেকে সেলাই, কম্পিউটার ও গবাদি পশু পালনের প্রশিক্ষণ গ্রহণ করি। আমি বর্তমানে দৌলতপুর সরকারি মতিলাল ডিগ্রি কলেজে ডিগ্রি ফাইনাল ইয়ারে অধ্যয়নরত আছি। অদম্য পরিশ্রমই সফল জয়িতা জননী রুবি আক্তার সকলের দোয়া চেয়েছেন।

উপজেলার চকমিরপুর ইউনিয়নের চরমাস্তুল গ্রামের মোঃ সুরুজ মন্ডলের স্ত্রী ছখিনা বেগম জানান- আমি আমার বাবার প্রথম কন্যা সন্তান। বাবা একজন প্রতিবন্ধী ও হতদরিদ্র মানুষ, দারিদ্রতা কি জিনিস তা আমি ছোট থেকেই বুঝি। আমাদের সম্বল বলতে ছিল থাকার একটি ছোট ছনের কুঁড়ে ঘর। বাবা ১২ বছর বয়সেই গ্রামবাসীর সহযোগিতায় আমাকে বিয়ে দেন। স্বামী একজন ভ্যানচালক, তার রোজগারের টাকা দিয়েই অভাবের সংসার চলত। সংসারের অভাব কিছুটা দূর করতে আমি ব্র্যাকের সাথে যোগাযোগ করি এবং ব্র্যাকের গণনাটক দলে যোগ দেই, এখান থেকে কিছু ভাতা পাই। পাশা পাশি বাড়ি-বাড়ি গিয়ে নকঁশীকাঁথা সেলাই এবং হাঁস-মুরগি পালন শুরু করি। বর্তমানে দুই বিঘা জমি, চারটি গরু ও পাকা একটি ঘর করেছি। আমার তিন ছেলে ও এক মেয়ে লেখাপড়া করছে। বর্তমানে সমাজে আমি স্বচ্ছল্য ভাবে চলছি। দারিদ্রতা থেকে স্বচ্ছ হওয়া জয়িতা নারী ছখিনা বেগম সকলের দোয়া চেয়েছেন।

উপজেলার চকমিরপুর ইউনিয়নের দৌলতপুর গ্রামের মোঃ আব্দুল রহমানের মেয়ে মাহবুবা ইসলাম জানান- আমার বাবা মৃত্যুবরণের পর মা আমাকে খুবই কষ্ট করে লালন পালন করে বড় করেন। বাবা মারা যাওয়ার সময় আমার বড় ভাইয়ের বয়স তখন পাঁচ বৎসর। অর্থাভাবে মা আমাদের পড়াশুনা করাতে না পাড়ায় ভাইকে ঢাকায় কাজে পাঠিয়ে দেয়। ভাইয়ের রোজগারের পাঠানো সামান্য টাকা দিয়ে মা বাড়ি-বাড়ি গিয়ে ধান ছাটাই করে আমার পড়ার খরচ চালাতো। এভাবে আমি গত ২০১১ সালে এস.এস.সি পাশ করি, পাশা পাশি প্রাইভেট পড়াই। গত ২০১৩ সালে এইচ.এস.সি পাশ করি। ভাগ্যের চাকায় ২০১৩ সালে আমার বেকার একটি ছেলের সাথে বিবাহ হয়। আমার একটি কন্যা সন্তান আছে, কন্যা সন্তানের কারণে শ্বশুর-শ্বাশুড়ী আমাকে দেখতে পারে না। এখন আমি ভাড়া বাড়িতে থাকি। যুব উন্নয়ন অফিসের মাধ্যমে সেলাই কাজ শিখেছি, স্বামী একটি কসমেটিকস্ দোকান দিয়েছে। আমার ইচ্ছে ছিল পড়াশুনা শেষে চাকুরী করব। নির্যাতনের বিভীষিকা মুঁছে ফেলা নতুন উদ্যমি জয়িতা নারী মাহবুবা ইসলাম সকলের দোয়া চেয়েছেন।

এদিকে দৌলতপুর উপজেলা মহিলা বিষয়ক কর্মকর্তা মোছাঃ আকলিমুন নেছা জানান- সরকারি ভাবে যত ধরণের মহিলাদের কর্মসংস্থানের সুযোগ রয়েছে সব সেবা নারীদের দেওয়া হচ্ছে এবং সেলাই প্রশিক্ষণের মাধ্যমে এগিয়ে যাচ্ছে নারীরা। জেলা ও উপজেলা থেকে বিভিন্ন ক্যাটাগরীতে নারীরা সাফল্য অর্জনের ক্ষেত্রে জয়িতা নারীদের বিভিন্ন জাতীয় দিবসে সম্মাননা ও ক্রেস্ট দেওয়া হয়েছে।