জাতীয়

ঝুঁকিপূর্ণ রেলযাত্রা বন্ধে দফায় দফায় নিষেধাজ্ঞা

ট্রেনের ছাদে যাত্রী ওঠার ওপর নিষেধাজ্ঞা নতুন কিছু নয়। প্রতি ঈদের আগেই ঝুঁকিপূর্ণ এ রেলযাত্রার ওপর রেলওয়ে বিভাগ এ ধরনের নিষেধাজ্ঞা জরি করে থাকে। দীর্ঘদিন ধরে দফায় দফায় এ নিষেধাজ্ঞা জারি করা হলেও তার বাস্তবায়ন দেখা যায় না।

তবে ব্রিটিশ আমলের রেলওয়ে আইনেই ট্রেনের ছাদ ছাড়াও ইঞ্জিনের সামনে, দুই বগির মাঝে যাত্রী ওঠা দণ্ডনীয় অপরাধের কথা উল্লেখ রয়েছে। ওই আইনে ১ বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড বা জরিমানা কিংবা উভয় দণ্ডে দণ্ডিতের বিধান আছে। এর পরও ১ সেপ্টেম্বর থেকে ট্রেনের ছাদে যাত্রী ওঠার ওপর নতুন করে নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে রেলওয়ে মন্ত্রণালয়।

বলা হয়েছে, ট্রেনের ছাদ-ইঞ্জিন-বাফারে ওঠলেই করা হবে জেল-জরিমানা। নতুন করে জারি করা এ নিষেধাজ্ঞা কার্যকরে গঠন করা হয়েছে ২৪টি বিশেষ টাস্কফোর্স। তবে রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ বলছে, এবার যে কোনো মূল্যে নিষেধাজ্ঞা কার্যকর করা হবে। কাউকে ছাড় দেয়া হবে না।

কথা হয় রেলওয়ে মহাপরিচালক শামছুজ্জামানের সঙ্গে। তিনি যুগান্তরকে বলেন, ট্রেনের ছাদ-ইঞ্জিন-বাফারে যাত্রী ওঠা সম্পূর্ণ নিষেধ। রেলওয়ে আইনে এটি দণ্ডনীয় অপরাধ। বহু চেষ্টা করেও এমন ঝুঁকিপূর্ণ যাত্রা নিয়ন্ত্রণে আনতে পারিনি। রেলপথমন্ত্রী এবার কঠোর নির্দেশনা দিয়েছেন। যে কোনো মূল্যে এবার নিয়ন্ত্রণ করব। এজন্য বিশেষ টাস্কফোর্স গঠন করা হয়েছে। বিভিন্ন ডিসি এবং স্থানীয় আইন প্রয়োগকারী সংস্থাকেও চিঠি দেয়া হয়েছে। সব সময় আমরা সর্বোচ্চ কঠোর অবস্থানে থাকব। অবৈধ এ যাত্রা ঠেকাতেই হবে। এমন নির্দেশ তো আগে বহুবার দেয়া হয়েছে? জবাবে তিনি বলেন, ‘আমরা নিরাশ হচ্ছি না। ট্রেনের গতি বাড়ানো, নিরাপদ যাত্রা ও রক্ষণাবেক্ষণ নিশ্চিত করতে এ নির্দেশনা বাস্তবায়ন করতেই হবে।’

জানতে চাইলে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের অধ্যাপক ড. শামসুল হক যুগান্তরকে বলেন, এ উদ্যোগ সত্যিই প্রশংসনীয়। কিন্তু রেলওয়ে তা বাস্তবায়ন করতে পারবে কিনা, সেটাই বড় প্রশ্ন। কঠোর আইন তো আছেই, তারপরও এমন নির্দেশনা! ঈদের সময় তো মানুষের কারণে ট্রেনই দেখা যায় না। এ দৃশ্য পৃথিবীর কোথাও দেখবেন না। কেন আইন প্রয়োগ হচ্ছে না। নির্দেশনা যেন তামাশায় পরিণত না হয়। যদি হয়, তাহলে এমন অবৈধ যাত্রা বাড়বে। তবে এ উদ্যোগের আগে সক্ষমতা বাড়াতে হবে। মুখে বললেই হবে না। মানসম্পন্ন টাস্কফোর্স গঠন এবং এর জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে হবে।

সূত্রে জানা যায়, ব্রিটিশ আমল থেকেই ট্রেনের ছাদ-ইঞ্জিন-বাফারে যাত্রীদের চলাচল ছিল। স্বাধীনতার পর বাড়তে থাকে। এ কারণে দুর্ঘটনা, লাইনচ্যুতসহ ট্রেনের ক্ষতিও হচ্ছে। এর আগে বহুবার উদ্যোগ নেয়া হলেও সফল হয়নি। প্রতি ঈদে চরম ঝুঁকি নিয়ে ট্রেন চলে, তিল ধারণের ঠাঁই থাকে না। বিজ্ঞপ্তি, মাইকিং ও সংবাদ সম্মেলন করেও যাত্রীদের সাবধান করা হয়েছে। কাজ হয়নি। এর ফলে ট্রেনের চাকাকেন্দ্রিক স্প্রিং নষ্ট হওয়াসহ ইঞ্জিনের ব্যাপক ক্ষতি হয়। এমনকি ছাদে থাকা পানির ট্যাংকিতে প্রস্রাব-পায়খানা পর্যন্ত করে দেন যাত্রীরা। ছাদকে কেন্দ্র করে রেলপথে গড়ে উঠেছে ছিনতাইকারী, পকেটমার, টানা পার্টি, ডাকাত, অজ্ঞান পার্টি, মাদক বাণিজ্য, কৃষ্ণমালা পার্টিসহ প্রায় ৮২টি অপরাধী গ্রুপ। ছাদে খুনের ঘটনাও ঘটছে প্রতিনিয়ত। এমন অবৈধ কর্মকাণ্ড রোধে রেল কর্তৃপক্ষ ফের কঠোর সিদ্ধান্তে গেল।

এরই মধ্যে অ্যাকশন শুরু হয়ে গেছে। শুক্রবার পূর্বাঞ্চল রেলপথে চলা বিভিন্ন ট্রেন থেকে ২৫ জনকে আটক করা হয়েছে। পূর্বাঞ্চল রেলওয়ের মহাব্যবস্থাপক নাসির উদ্দিন আহমেদ জানান, অ্যাকশন শুরু হয়ে গেছে। ছাদ-ইঞ্জিন-বাফারে যাকে পাওয়া যাবে, তাকেই আটক করা হবে। আগে তাদের আটক করে জরিমানা হিসেবে টিকিট কাটিয়ে ছেড়ে দেয়া হতো, এবার জরিমানাসহ জেল দেয়া হবে। তিনি বলেন, তার অঞ্চলে ৮টি বিশেষ টাস্কফোর্স গঠন করা হয়েছে। প্রচার চালানো হচ্ছে। যেসব স্টেশন থেকে যাত্রীরা ছাদে ওঠেন, সেখানে অতিরিক্ত জনবল দেয়া হয়েছে। তবে বাণিজ্য বিভাগের এক কর্মকর্তা জানান, এমন অভিযান করতে গিয়ে প্রায়ই রেলওয়ের কর্মকর্তারা স্থানীয় লোকজন দ্বারা হেনস্তা-মারধরের শিকার হয়েছেন। তবে এবার পুলিশ থাকবে বলেও জানিয়েছে রেল কর্তৃপক্ষ।

শুক্রবার জামালপুরের দেওয়ানগঞ্জ, ইসলামপুর, মেলান্দহ স্টেশন থেকে ট্রেনের ছাদে ওঠার জন্য ব্যবহৃত ৮০টি মই উদ্ধার করেছে রেলওয়ে পুলিশ। অভিযোগ রয়েছে, স্টেশন মাস্টার, জিআরপি, আরএনবি সদস্যদের ছত্রছায়ায় মই পার্টি গড়ে উঠেছে।

পশ্চিমাঞ্চল রেলের মহাব্যবস্থাপক (জিএম) মো হারুন-অর-রশীদ জানান, এ অঞ্চলে ১৬টি টাস্কফোর্স টিম গঠন করা হয়েছে। কমিটিতে রেলের কর্মকর্তা, নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্য ও জিআরপি পুলিশদের সদস্যরা রয়েছেন। এ টাস্কফোর্স ট্রেন ছাড়ার সময় প্ল্যাটফর্মে অবস্থান নিয়ে ছাদে ভ্রমণ রোধে কাজ করবে।

স্টেশনগুলোতে মাইকিং শুরু হয়েছে। এছাড়া স্টেশনের ডিজিটাল ডিসপ্লেতে এ সংক্রান্ত নির্দেশনা প্রচার করা হচ্ছে। জেলা প্রশাসককে চিঠি দেয়া হয়েছে। অভিযান পরিচালনায় ম্যাজিস্ট্রেট দেয়ার জন্যও আবেদন করা হয়েছে।

রেলে ৩৫২টি যাত্রীবাহী ট্রেন চলাচল করছে। ৪৬৬টি স্টেশনের মধ্যে পশ্চিমাঞ্চলে ২৩৮ এবং পূর্বাঞ্চলে ২২৮টি স্টেশন রয়েছে। রেলওয়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর এক কর্মকর্তা জানান, প্রতিটি স্টেশন থেকেই ট্রেনের ছাদে লোকজন ওঠে। চলন্ত অবস্থায় ছাদ থেকে তাদের আটক করারও ঝুঁকি রয়েছে। তাছাড়া ছাদে-ইঞ্জিনে ওঠা এসব যাত্রী বিশেষ কৌশলে গন্তব্য স্টেশনে পৌঁছার ২-৩ মিনিট আগে জানালা-দরজা দিয়ে নেমে পড়েন। এরা চলন্ত অবস্থায় জানালা-দরজা দিয়ে ছাদে ওঠে পড়েন। ফলে এ অভিযানের সফলতা নিয়ে সন্দেহ থেকেই যাচ্ছে। মানুষকে সচেতন করতে পারলেই এমনটা বন্ধ হতে পারে।

রেলপথ সচিব মো. মোফাজ্জেল হোসেন বলেন, স্যারের (রেলপথমন্ত্রী) কঠোর নির্দেশনা রয়েছে, যে কোনো মূল্যেই এমন ঝুঁকির যাত্রা রোধ করতে হবে। রেলওয়ে আইনেও এটি দণ্ডনীয় অপরাধ। ইতিমধ্যে বিশেষ প্রস্তুতি নেয়া হয়েছে। ১ সেপ্টেম্বর থেকে কোনো ট্রেনের ছাদেই লোকজনকে ওঠতে দেয়া হবে না। ওঠলেই কঠোর শাস্তির আওতায় আনা হবে। আমরা সবার সহযোগিতা চাই। সাধারণ যাত্রীরাও যেন ছাদে ওঠা যাত্রীদের নিরুৎসাহিত করেন। ছাদে যাত্রী ওঠায় ট্রেন চালাতে ব্যাপক সমস্যাও হচ্ছে। অভ্যাস পরিবর্তন করতেই হবে। সামাজিকভাবেও প্রচার চালানো প্রয়োজন।