আইন আদালত

খালেদার অনুপস্থিতিতে বিচার হবে কি না, আদেশ ২০ সেপ্টেম্বর

জিয়া চ্যারিটেবল ট্রাস্ট দুর্নীতির মামলায় বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া আদালতে আসতে অনিচ্ছুক। তাই প্রাক্তন এ প্রধানমন্ত্রীর জামিন বৃদ্ধি হবে কি না এবং তার অনুপস্থিতিতে বিচারকাজ চলবে কি না, সে বিষয়ে আদেশের জন্য আগামী ২০ সেপ্টেম্বর দিন ধার্য করেছেন আদালত।

বৃহস্পতিবার পুরান ঢাকার পুরনো কেন্দ্রীয় কারাগারে নবনির্মিত অস্থায়ী বিশেষ জজ আদালত-৫ এর বিচারক ড. মো. আখতারুজ্জামান এ বিষয়ে শুনানি শেষে ওই দিন ঠিক করেন।

আজ এ মামলায় যুক্তিতর্ক উপস্থাপনের জন্য দিন ধার্য ছিল। এজন্য খালেদা জিয়াকে কারা কর্তৃপক্ষ আদালতে হাজির করতে চায়। কিন্তু খালেদা জিয়া কারা কর্তৃপক্ষকে জানান, তিনি আদালতে আসতে অনিচ্ছুক। কারা কর্তৃপক্ষ আদালতকে তা জানিয়েছে।

বৃহস্পতিবার বেলা ১১ টা ৪২ মিনিটে মামলার কার্যক্রম শুরু হয়। শুরুতে দুদকের আইনজীবী মোশাররফ হোসেন কাজল বলেন, আজ এ মামলায় জামিন বৃদ্ধি হবে কি না এবং তার অনুপস্থিতিতে মামলার বিচারকাজ চলবে কি না সে বিষয়ে আইনগত শুনানির জন্য দিন ধার্য আছে। এ বিষয়ে শুনানি হয়ে গেলে আমরা যুক্তিতর্ক শুরু করতে পারব।

এরপর খালেদা জিয়ার আইনজীবী সানাউল্লাহ মিয়া বলেন, গত ৫ তারিখ খালেদা জিয়া আদালতে এসেছেন। গতকাল আসেননি। অসুস্থ থাকায় তিনি আদালতে আসতে অনিচ্ছুক। তার চিকিৎসার বিষয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সাথে সাক্ষাৎ করা হয়ে হয়েছে। মেডিক্যাল বোর্ড গঠনের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এখন খালেদা জিয়ার কী অবস্থা বা তিনি কেন আদালতে আসতে অনিচ্ছুক, জানি না। এক্ষেত্রে আমাকে এবং মাসুদ আহম্মেদ তালুকদারকে কারাগারে খালেদা জিয়ার সাথে সাক্ষাতের অনুমতি দিলে তার শারীরিক অসুস্থতা এবং কেন আসতে অনিচ্ছুক তা জানতে পারব।

এরপর মাসুদ আহম্মেদ তালুকদার বলেন, খালেদা জিয়া অসুস্থ হয়ে আপনার আদালতে হাজির হয়েছিলেন। তিনি আপনাকে (বিচারক) তার অসুস্থতার কথা বলেছেন। অনিচ্ছুক এর অর্থ তিনি অসুস্থ, শারীরিকভাবে সক্ষম নন আদালতে আসতে। শারীরিক অসুস্থতাই তার আদালতে আসতে অনিচ্ছার কারণ। আর জেল কর্তৃপক্ষ যে লেখা দিয়েছে, তাতে অর্থ দাঁড়ায়- আদালতের প্রতি তার অবজ্ঞা। কিন্তু তা নয়, তিনি অসুস্থ, এখানে আদালতে আসতে চাননি।

তিনি বলেন, আপনার প্রতি আমাদের অনাস্থা নেই। কখনো বলিনি, আপনার কাছে ন্যায়বিচার পাব না। কারাগারে আদালত স্থাপনের বিষয়টি আমরা প্রধান বিচারপতির সাথে সাক্ষাৎ করে বলেছি। বিষয়টি বিবেচনাধীন। তাছাড়া খালেদা জিয়া আপনার কাস্টডিতে আছেন। তাকে আদালতে হাজির করার দায়িত্ব এখন আপনার। আমরা আপনার মাধ্যমে তার খবর জানতে পারি। তিনি অসুস্থ, এজন্য সরকারের উচ্চ মহলের আদেশে মেডিক্যাল বোর্ড গঠন করা হয়েছে।

অসুস্থ খালেদা জিয়ার সাথে সাক্ষাতের অনুমতি এবং মামলার কার্যক্রম মুলতবির আবেদন করেন মাসুদ আহম্মেদ তালুকদার।

মামলার অপর দুই আসামি ড. মো. জিয়াউল ইসলাম মুন্না ও মো. মনিরুল ইসলাম খানের জামিনের মেয়াদ বাড়ানোর আবেদন করেন তার আইনজীবীরা। তারা বলেন, মামলার তিন আসামির মধ্যে দুজন আদালতে আছেন। খালেদা জিয়া উপস্থিত নেই। কোরাম পূরণ না হওয়ায় (সকল আসামির উপস্থিতি) শুনানির সুযোগ নেই। শুধু রুটিনওয়ার্ক করা যায়। যুক্তিতর্ক করতে পারবেন না।

জবাবে মোশাররফ হোসেন কাজল বলেন, এখানে কি কেবিনেট মিটিং চলছে যে চেয়ারম্যান বা পরিচালক না এলে মিটিং করা যাবে না। খালেদা জিয়া আদালতে আসেননি। তার আইনজীবীরা তার সাথে দেখা করতে চান, করেন। এখানে আরো দুই আসামি উপস্থিত আছেন। তারা খালেদা জিয়ার সাথে মামলার কার্যক্রম সংযোজন করতে চলেছেন। তারা আরেকজনের কাঁধে চড়ছেন। খালেদা জিয়া আসছেন না। উনি (খালেদা জিয়া) না আসতে পারলে ডিসপেন্স করে মামলা পরিচালনা করতে পারি। উনি না আসলে রিপ্রেজেন্ট করেন।

তিনি বলেন, উনারা আসছেন। এসে বলছেন, জামিন দেন। জামিন দিলে চলে যাচ্ছেন। খালেদা জিয়া না আসলে তার অনুপস্থিতিতে আইনজীবীরা কথা বলবেন। কেউ আদালতে না আসলে আদালত বসে থাকবে না, নিজস্ব গতিতে চলবে। খালেদা জিয়া সম্মানিত ব্যক্তি, সম্মানের সাথে তার মামলা শেষ করি। আইনের ব্যত্যয় ঘটিয়ে কাজ করব না। খালেদা জিয়াকে ডিসপেন্স করে অপর দুই আসামির পক্ষে যুক্তি উপস্থাপনের জন্য বলেন। তারপরও যদি তারা তা না করে জামিন চান তাহলে মামলার কার্যক্রম শেষ করে রায়ের তারিখ ধার্যের জন্য বলেন তিনি।

তখন খালেদা জিয়ার আইনজীবীরা বলেন, যেকোনো আসামির বিচার দেখা বা শ্রবণ করা সাংবিধানিক অধিকার। আর খালেদা জিয়া অপর আসামিদের যুক্তিতর্ক শুনতে চেয়েছিলেন। তিনি অসুস্থ, মেডিক্যাল বোর্ড গঠন করা হয়েছে। আর মেডিক্যাল তো আজীবন ঝুলে থাকবে না। আমাদের তার সাথে সাক্ষাৎ করার সুযোগ দিন। তার কী অবস্থা, আর আসতে কেন অনিচ্ছুক তার কারণ আমরা জানব।

মোশাররফ হোসেন কাজল বলেন, খালেদা জিয়া আদালতে আসছেন না। আদালতকে সহযোগিতা করছেন না। আগে অসুস্থ থাকায় আদালতে আসতেন না, ঠিক ছিল। কিন্তু এখন ইচ্ছাকৃতভাবে আসছেন না। আর জোর করে তাকে আদালতে আনা যায় না।

তিনি ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে খালেদা জিয়ার মামলার কার্যক্রম চালানোর আবেদন করেন। আর ওই দুই আসামির পক্ষে যুক্তিতর্ক তুলে ধরার আবেদন করেন। যুক্তি তুলে ধরার পর জামিন শুনানি করতে বলেন। তারা যুক্তিতর্ক তুলে না ধরলে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করে রায়ের তারিখ ধার্য করার আবেদন করেন।

খালেদা জিয়ার অসুস্থতা, মেডিক্যাল বোর্ড গঠন ও তার সাথে সাক্ষাতের বিষয় নিয়ে প্রায় দেড় ঘণ্টার মতো দুদকের আইনজীবী ও আসামিপক্ষের আইনজীবীদের মধ্যে তর্ক-বিতর্ক হয়।

উভয় পক্ষের শুনানি শেষে খালেদা জিয়া আদালতে না আসলে তার জামিন বৃদ্ধি হবে কি না এবং তার অনুপস্থিতে মামলার বিচারকাজ চলবে কি না সে বিষয়ে আদেশের জন্য আগামী ২০ সেপ্টেম্বর দিন ধার্য করেন আদালত। অপর দুই আসামির জামিন মঞ্জুর করেন। খালেদা জিয়ার সাথে ওই দুই আইনজীবীর সাক্ষাতের বিষয়ে জেল কোড অনুযায়ী ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশ দেন।

বেলা ১ টা ১০ মিনিটে আদালতের কার্যক্রম শেষ হয়।

এদিকে, সকাল থেকেই মামলার কার্যক্রমকে কেন্দ্র করে আদালতের বাইরে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য বিপুল সংখ্যক মোতায়েন করা হয়।

উল্লেখ্য, জিয়া চ্যারিটেবল ট্রাস্ট মামলায় গত ১ ফেব্রুয়ারি আসামি জিয়াউল হক মুন্নার পক্ষে যুক্তিতর্ক শুনানি অব্যাহত রয়েছে এবং খালেদা জিয়ার পক্ষে যুক্তি উপস্থাপন বাকি আছে।

এদিকে, একই বিচারক গত ৮ ফেব্রুয়ারি খালেদা জিয়াকে ৫ বছর কারাদণ্ড দেন এবং ওই দিনেই তাকে কারাগারে পাঠান। তিনি নাজিমুদ্দিন রোডের পুরোনো কেন্দ্রীয় কারাগারে আছেন।

২০১১ সালের ৮ আগস্ট খালেদা জিয়াসহ চারজনের বিরুদ্ধে ৩ কোটি ১৫ লাখ ৪৩ হাজার টাকা আত্মসাতের অভিযোগে জিয়া চ্যারিটেবল ট্রাস্ট মামলা দায়ের করে দুদক। এ মামলায় ২০১২ সালের ১৬ জানুয়ারি আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করে দুদক।

মামলাটিতে বিএনপি নেতা হারিছ চৌধুরী এবং তার তৎকালীন একান্ত সচিব জিয়াউল ইসলাম মুন্না ও ঢাকা সিটি করপোরেশনের প্রাক্তন মেয়র সাদেক হোসেন খোকার একান্ত সচিব মনিরুল ইসলাম খান আসামি।

মামলাটিতে খালেদা জিয়াসহ অপর আসামিদের বিরুদ্ধে ২০১৪ সালের ১৯ মার্চ তৎকালীন বিচারক বাসুদেব রায় অভিযোগ গঠন করেন।